॥ অধ্যায় ৭, শ্লোক ২১ ॥

যো যো যাং যাং তনুং ভক্তঃ শ্রদ্ধয়ার্চিতুমিচ্ছতি ।
তস্য তস্য অচলাং শ্রদ্ধাং তামেব বিদধাম্যহম্ ॥ ৭.২১ ॥

সরল ভাবার্থ:

যে যে ভক্ত শ্রদ্ধার সাথে যে যে দেবতারূপের পূজা করতে ইচ্ছা করেন, আমি তাঁর সেই শ্রদ্ধাকে সেই দেবতার প্রতিই অটল বা দৃঢ় করে দিই।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

এই শ্লোকটি পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের অসীম উদারতা এবং মনস্তাত্ত্বিক পরিচালনার এক অপূর্ব নিদর্শন। এটি আমাদের ধর্মের বহুত্ববাদের পেছনের ঐক্যকে বুঝিয়ে দেয়।

১. ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা ও স্বাধীনতা: হিন্দুধর্মে অনেক দেব-দেবীর রূপ আছে। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, মানুষ তাঁর নিজের রুচি, সংস্কার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন দেবতার (যেমন গণেশ, শিব বা শক্তি) পূজা করতে চায়। ঈশ্বর মানুষকে জোর করে কোনো পথে আনেন না, বরং তিনি মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতাকে সম্মান করেন। ভক্ত যে রূপেই পরম সত্যকে খুঁজতে চায়, ঈশ্বর সেই রূপেই তাকে সাহায্য করেন।

২. অচলা শ্রদ্ধা বা বিশ্বাস রক্ষা: ‘তস্য তস্য অচলাং শ্রদ্ধাং’—এটি অত্যন্ত গভীর কথা। যখন কোনো ভক্ত কোনো দেবতার পূজা করেন, তখন তাঁর মনে যে বিশ্বাসের উদয় হয়, সেই বিশ্বাসকে অটল রাখার কাজটি করেন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ। তিনি অন্তর্যামী হিসেবে জানেন যে সেই ভক্তের বর্তমান স্তরে এই পূজাটিই জরুরি। তাই তিনি ভক্তের মনে সংশয় আসতে দেন না, বরং তাঁর নিষ্ঠাকে আরও বাড়িয়ে দেন। এটি আমাদের শেখায় যে কোনো ধর্মনিষ্ঠ মানুষের বিশ্বাসকে তুচ্ছ করা উচিত নয়।

৩. একই শক্তির বিভিন্ন প্রকাশ: শ্রীকৃষ্ণ এখানে নিজেকে সব দেবতার ঊর্ধ্বে এক ‘সুপার পাওয়ার’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। সব দেবতাই তাঁরই বিভূতি বা শক্তির একেকটি চ্যানেল। যেমন একটি পাওয়ার হাউস থেকে বিভিন্ন ট্রান্সফর্মারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়, তেমনি শ্রীকৃষ্ণই সব দেবতার মাধ্যমে তাঁর করুণা বিতরণ করেন। ভক্ত হয়তো ভাবছেন তিনি অন্য কোনো দেবতাকে ডাকছেন, কিন্তু সেই ডাকের গন্তব্য এবং উত্তরদাতা স্বয়ং পরমাত্মা।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের সাম্প্রদায়িকতা ও গোঁড়ামি থেকে মুক্ত করে। এটি আমাদের শেখায় যে ভক্তির লক্ষ্য যাই হোক না কেন, ভক্তির ‘তীব্রতা’ বা শ্রদ্ধাই আসল। ঈশ্বর আমাদের বিশ্বাসের অমর্যাদা করেন না। এটি আমাদের অন্যের উপাসনা পদ্ধতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায়।