স তয়া শ্রদ্ধয়া যুক্তস্তস্যারাধনমীহতে ।
লভতে চ ততঃ কামান্ ময়ৈব বিহিতান্ হি তান্ ॥ ৭.২২ ॥
সরল ভাবার্থ:
তিনি সেই শ্রদ্ধাযুক্ত হয়ে সেই দেবতার আরাধনা করেন এবং সেই দেবতার মাধ্যমেই তাঁর কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেই সব ফল আমা (শ্রীকৃষ্ণ) দ্বারাই বিহিত বা অনুমোদিত হয়।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:
এই শ্লোকটি কর্মফল এবং বর লাভের এক নিগূঢ় সত্য প্রকাশ করে। আমরা যখন কোনো দেবতার কাছে কিছু চাই এবং তা পাই, তখন আসলে দাতা কে—তা এখানে পরিষ্কার করা হয়েছে।
১. আরাধনা ও ফল লাভ: ভক্ত যখন নিষ্ঠার সাথে কোনো দেবতার পূজা করেন, তখন সেই দেবতার কৃপায় তিনি তাঁর জাগতিক কামনা (কামান্) পূরণ করতে পারেন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ এখানে এক বড় সত্য ফাঁস করেছেন—‘ময়ৈব বিহিতান্ হি তান্’। এর মানে হলো, কোনো দেবতাই স্বতন্ত্রভাবে ফল দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন না। যেমন একজন ব্যাঙ্ক অফিসার আপনাকে লোন দিলেও টাকাটা আসলে ব্যাঙ্কের মালিকের। তেমনি দেবতারা হলেন ঈশ্বরের মনোনীত অধিকারী, কিন্তু দেওয়ার ক্ষমতা বা পারমিশন আসে পরমেশ্বরের কাছ থেকে।
২. ঈশ্বরের অদৃশ্য হাত: এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে জগত এক সুশৃঙ্খল নিয়মে চলছে। পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণই সমস্ত কর্মফলের বিধানকর্তা। আমরা যে সুখ বা সাফল্য পাই, তা কোনো অন্ধ শক্তির খেল নয়, বরং তা ভগবানেরই দান। দেবতারা এখানে মাধ্যম হিসেবে কাজ করেন। এটি জানলে আমাদের দেবভক্তি আরও গভীর হয় কারণ আমরা বুঝতে পারি যে সব শক্তির উৎস এক।
৩. উপলব্ধির অভাব: সাধারণ ভক্তরা মনে করেন যে ওই বিশেষ দেবতাটিই তাঁকে সবকিছু দিলেন। তাঁরা পেছনের মূল শক্তিকে চিনতে পারেন না। এটি এক প্রকারের ‘অজ্ঞানতা’ হলেও ভগবান একেও স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি দয়ালু পিতা হিসেবে সন্তানের আবদার পূরণ করেন, যদিও সন্তান হয়তো জানে না যে এই খেলনাটি আসলে তাঁর বাবা দিয়েছেন।
ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের একনিষ্ঠ ভক্তির দিকে নিয়ে যায়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে যদি সব ফল কৃষ্ণই দেন, তবে কেন আমরা সরাসরি কৃষ্ণের আরাধনা করব না? এটি আমাদের শাখা-প্রশাখা বাদ দিয়ে গাছের গোড়ায় জল দেওয়ার প্রেরণা যোগায়। এই উপলব্ধিতাই আমাদের মুক্তি ও উচ্চতর শান্তির দিকে নিয়ে যায়।