॥ অধ্যায় ৭, শ্লোক ২৩ ॥

অন্তবৎ তু ফলং তেষাং তদ্ভবত্যল্পমেধসাম্ ।
দেবান্ দেবযজো যান্তি মদ্ভক্তা যান্তি মামপি ॥ ৭.২৩ ॥

সরল ভাবার্থ:

কিন্তু সেই অল্পবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিদের লব্ধ ফল বিনাশশীল (অস্থায়ী)। যারা দেবতাদের উপাসনা করেন তারা দেবতাদের লোকে যান, আর যারা আমার ভক্ত তারা আমাকেই (পরম গতি) প্রাপ্ত হন।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

এখানে শ্রীকৃষ্ণ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জাগতিক উপাসনা এবং পারমার্থিক উপাসনার মধ্যে পার্থক্য বুঝিয়ে দিয়েছেন। এটি আমাদের জীবনের লক্ষ্য স্থির করার জন্য এক সতর্কবাণী।

১. অন্তবৎ ফল বা অস্থায়ী সুখ: যারা দেব-দেবীর কাছে টাকা, বাড়ি বা স্বর্গের সুখ চায়, তাদের সেই ফল একদিন শেষ হয়ে যাবে (অন্তবৎ)। কারণ এই পৃথিবী এবং স্বর্গ—উভয়ই নশ্বর। প্রলয়ের সময় সব লয় হয়ে যাবে। তাই শ্রীকৃষ্ণ এদের ‘অল্পমেধসাম্’ বা অল্পবুদ্ধি বলেছেন। কারণ তারা সামান্য খেলনার জন্য অমূল্য রত্নকে (ঈশ্বরকে) ছেড়ে দিচ্ছে। এটি যেমন কোনো হীরা দিয়ে সাধারণ পাথর কেনা।

২. গন্তব্যের পার্থক্য: আপনি যার উপাসনা করবেন, তাঁরই সান্নিধ্য পাবেন। দেবতাদের উপাসক দেবতাদের লোকে (স্বর্গে) যান, কিন্তু সেখানেও সুখ ভোগ করে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসতে হয়। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ বলছেন ‘মদ্ভক্তা যান্তি মামপি’—অর্থাৎ আমার ভক্তরা আমার কাছেই আসে। আর কৃষ্ণের ধামে একবার পৌঁছালে আর কোনোদিন জন্ম-মৃত্যুর কষ্ট ভোগ করতে হয় না। এটিই হলো ‘পরম গতি’।

৩. স্বার্থ বনাম নিঃস্বার্থ প্রেম: দেবতাদের পূজা অনেক সময় গিভ-অ্যান্ড-টেক পলিসিতে হয়। কিন্তু কৃষ্ণের ভক্তি হলো প্রেমের জন্য। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে জীবনের ছোট ছোট জিনিসের জন্য শক্তি অপচয় না করে পরম মুক্তির জন্য চেষ্টা করা উচিত। আমাদের আকাঙ্ক্ষা যেন বড় হয়, নশ্বর জিনিসের জন্য যেন আমরা আমাদের আত্মাকে বিক্রি না করি।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের বৈরাগ্য এবং বিবেক দান করে। এটি আমাদের শেখায় যে সত্যই যদি শান্ত ও চিরস্থায়ী কিছু পেতে হয়, তবে পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ ছাড়া আর কোনো আশ্রয় নেই। এই শ্লোকটি আমাদের ‘সकाम’ কর্ম থেকে ‘নিষ্কकाम’ ভক্তির দিকে নিয়ে যাওয়ার এক অমোঘ অনুপ্রেরণা।