॥ অধ্যায় ৭, শ্লোক ২৪ ॥

অব্যক্তং ব্যক্তিমাপন্নং মন্যন্তে মামবুদ্ধয়ঃ ।
পরং ভাবমজানন্তো মমাব্য়য়মনুত্তমম্ ॥ ৭.২৪ ॥

সরল ভাবার্থ:

বুদ্ধিহীন ব্যক্তিরা আমার শ্রেষ্ঠ, অব্যয় এবং অনুত্তম স্বরূপকে না জেনে মনে করেন যে আমি অব্যক্ত বা নিরাকার থেকে ব্যক্ত বা সাকার মানুষে পরিণত হয়েছি।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

এই শ্লোকটি শ্রীকৃষ্ণের অবতার তত্ত্ব এবং তাঁর শাশ্বত স্বরূপ সম্পর্কে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা। এটি ভ্রান্ত ধারণা দূর করার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

১. অব্যক্ত ও ব্যক্তের রহস্য: অনেকে মনে করেন যে ভগবান আদিতে কেবল একটি শক্তি বা নিরাকার আলো ছিলেন এবং পরে কোনো প্রয়োজনে তিনি মানুষের শরীর ধরে এসেছেন। শ্রীকৃষ্ণ একে ‘অবুদ্ধয়ঃ’ বা বুদ্ধিহীনতা বলেছেন। কারণ তাঁর স্বরূপ কখনোই পরিবর্তন হয় না। তিনি সর্বদা সাকার ও নিরাকার—উভয় রূপেই বিরাজমান। তাঁর শরীর আমাদের মতো রক্ত-মাংসের নয়, এটি ‘সচ্চিদানন্দ’ বিগ্রহ।

২. পরং ভাব বা শ্রেষ্ঠ স্বরূপ: শ্রীকৃষ্ণের স্বরূপ ‘অব্যয়’ (অক্ষয়) এবং ‘অনুত্তম’ (যার চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কেউ নেই)। তিনি মায়া দ্বারা শরীরের বন্ধনে আবদ্ধ হন না। সাধারণ মানুষ তাঁকে কেবল যশোদার পুত্র বা একজন রাজা হিসেবে দেখে, কিন্তু তাঁর অলৌকিক ঈশ্বরীয় স্বরূপকে চিনতে পারে না। এটি আমাদের শেখায় যে ভগবানকে আমাদের সাধারণ মানুষের দাঁড়িপাল্লায় মাপা উচিত নয়।

৩. তত্ত্বজ্ঞান ও ভক্তি: এই শ্লোকটি আমাদের অবতারের প্রকৃত রহস্য বুঝতে সাহায্য করে। তিনি দয়া করে আমাদের মাঝে আসেন যাতে আমরা তাঁর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারি। কিন্তু এর মানে এই নয় যে তিনি আমাদের মতো সীমাবদ্ধ। এই সত্যটি জানলে আমাদের ভক্তি আরও গভীর ও গম্ভীর হয়। আমরা তাঁর চরণের মহিমা বুঝতে পারি।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের শ্রদ্ধা এবং জ্ঞানের সমন্বয় ঘটায়। এটি আমাদের শেখায় যে বিগ্রহ পূজা বা অবতারের উপাসনা মানে কোনো মরণশীল মানুষের পূজা নয়, বরং সাকার রূপে সেই পরমেশ্বরেরই আরাধনা। এটি ঈশ্বরকে সীমাবদ্ধ করে দেখার মানসিকতা থেকে আমাদের মুক্ত করে।