নাহং প্রকাশঃ সর্বস্য যোগমায়াসমাবৃতঃ ।
মূঢ়োঽয়ং নাভিজানাতি লোকো মামজমব্যয়ম্ ॥ ৭.২৫ ॥
সরল ভাবার্থ:
আমি সবার কাছে প্রকাশিত হই না, কারণ আমি আমার ‘যোগমায়া’ দ্বারা আবৃত থাকি। তাই এই মূঢ় জগত আমার জন্মহীন এবং অবিনাশী স্বরূপকে জানতে পারে না।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:
ভগবান যদি সর্বত্র থাকেন, তবে কেন আমরা তাঁকে দেখি না? শ্রীকৃষ্ণ এখানে সেই পর্দার কথা বলেছেন যা তাঁকে আমাদের চোখ থেকে আড়াল করে রাখে।
১. যোগমায়ার পর্দা: যোগমায়া হলো ভগবানের এক বিশেষ শক্তি যা ভক্তের জন্য প্রেম তৈরি করে আর অভক্তের জন্য পর্দা হয়ে দাঁড়ায়। যেমন মেঘ সূর্যকে ঢেকে রাখে না, বরং আমাদের চোখকে ঢেকে দেয়—তেমনি মায়া আমাদের বুদ্ধিকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে যে আমরা সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ঈশ্বরকেও চিনতে পারি না। এটি এক প্রকারের আধ্যাত্মিক ফিল্টার যা কেবল পবিত্র হৃদয়ের কাছেই ঈশ্বরকে দৃশ্যমান করে।
২. অজ ও অব্যয়: কৃষ্ণ নিজেকে ‘অজ’ (অজাত বা জন্মহীন) বলেছেন। তাঁর জন্ম বা মৃত্যু সাধারণ মানুষের মতো কর্মফল অনুযায়ী হয় না। তিনি ইচ্ছাময়। কিন্তু মূঢ় জগত তাঁকে সাধারণ মানুষের মতো মনে করে ভুল করে। এই মোহ মানুষের মনে অহংকার এবং অবিশ্বাস জন্মায়। যোগমায়ার এই খেলা বুঝতে পারা বড় কঠিন।
৩. প্রকাশের শর্ত: শ্রীকৃষ্ণ এখানে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে তিনি কোনো জড় বস্তু নন যে চাইলেই দেখা যাবে। তিনি পরম পুরুষ। তাঁর প্রকাশ নির্ভর করে আমাদের ব্যাকুলতার ওপর। আমরা যখন মায়ার প্রলোভন ত্যাগ করে তাঁকে চাই, তখনই তিনি পর্দা সরিয়ে দেখা দেন। এটি আমাদের সাধনার পথে আরও একনিষ্ঠ হতে শেখায়।
ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের নম্রতা শেখায়। আমরা যেন কখনো না বলি যে ঈশ্বর নেই কারণ আমরা তাঁকে দেখছি না। বরং আমাদের স্বীকার করা উচিত যে আমাদের চোখে মায়ার পর্দা আছে। ভক্তি ও জপের মাধ্যমে এই পর্দা সরানোই হলো সাধকের আসল কাজ। এটি ঈশ্বরকে জানার এক গভীর রহস্য।