॥ অধ্যায় ৭, শ্লোক ৪ ॥

ভূমিরাপোঽনলো বায়ুঃ খং মনো বুদ্ধিরেব চ ।
অহঙ্কার ইতীয়ং মে ভিন্না প্রকৃতিরষ্টধা ॥ ৭.৪ ॥

সরল ভাবার্থ:

ভূমি, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ, মন, বুদ্ধি এবং অহংকার—এই আটটি ভাগে বিভক্ত আমার এই অপরা (জড়) প্রকৃতি।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

এখান থেকে শ্রীকৃষ্ণ সৃষ্টিতত্ত্ব বা কসমোলজি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। এটি ঈশ্বর ও প্রকৃতির সম্পর্কের এক গভীর বিশ্লেষণ।

১. পঞ্চভূত বা স্থূল প্রকৃতি: ক্ষিতি (মাটি), অপ (জল), তেজ (অগ্নি), মরুৎ (বায়ু) ও ব্যোম (আকাশ)—এই পাঁচটি উপাদান দিয়ে আমাদের দৃশ্যমান জগত গঠিত। আমাদের শরীর থেকে শুরু করে বিশাল গ্রহ-নক্ষত্র সবকিছুই এই পাঁচ উপাদানের সংমিশ্রণ। শ্রীকৃষ্ণ এখানে বলছেন যে এই জড় জগত আসলে তাঁরই প্রকৃতির একটি রূপ। এটি কোনো স্বাধীন সত্তা নয়, এটি পরমেশ্বরের শক্তিরই প্রকাশ।

২. সূক্ষ্ম প্রকৃতি: কেবল পঞ্চভূত নয়, মন, বুদ্ধি ও অহংকারকেও শ্রীকৃষ্ণ তাঁর প্রকৃতির অংশ বলেছেন। মন হলো ইন্দ্রিয়ের পরিচালক, বুদ্ধি হলো বিচারশক্তি এবং অহংকার হলো ‘আমি’ বোধ। সাধারণত আমরা মনে করি মন বা বুদ্ধি আমাদের নিজস্ব। কিন্তু কৃষ্ণ বলছেন এগুলোও প্রকৃতিরই অংশ। অহংকারই হলো সেই পর্দা যা আমাদের আসল আত্মা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। এই আটটি উপাদানকে বলা হয় ‘অষ্টধা প্রকৃতি’।

৩. অপরা প্রকৃতি: এই আটটি উপাদানই হলো ‘অপরা’ বা নিম্নতর প্রকৃতি। একে অপরা বলার কারণ হলো এটি পরিবর্তনশীল এবং জড়। এটি সৃষ্টি হয় এবং ধ্বংস হয়। কিন্তু এর পেছনে যে পরমাত্মা আছেন, তিনি অপরিবর্তনীয়। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে আমরা যা কিছু দেখছি বা অনুভব করছি, সবই এক বিশাল মহাজাগতিক শক্তির খেলা মাত্র।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতাকে মেলাতে সাহায্য করে। আধুনিক বিজ্ঞান যেখানে পর্যায় সারণী (Periodic Table) দিয়ে জগত বুঝতে চায়, গীতা সেখানে মন ও অহংকারকেও প্রকৃতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। এটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে আমরা কেবল শরীর নই, আমাদের ভেতরে এক বিশাল জটিল যান্ত্রিক ব্যবস্থা আছে যা পরমেশ্বর পরিচালনা করছেন।