॥ অধ্যায় ৭, শ্লোক ৫ ॥

অপরেয়মিতস্ত্বন্যাং প্রকৃতিং বিদ্ধি মে পরাম্ ।
জীবভূতাং মহাবাহো যয়েদং ধার্যতে জগৎ ॥ ৭.৫ ॥

সরল ভাবার্থ:

হে মহাবীর অর্জুন! এই আট প্রকার অপরা প্রকৃতি ছাড়াও আমার অন্য একটি শ্রেষ্ঠ বা ‘পরা’ প্রকৃতি আছে, যা হলো জীবশক্তি। এই জীবশক্তির মাধ্যমেই এই সমগ্র জগত ধৃত বা পরিচালিত হচ্ছে।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

আগের শ্লোকে জড় প্রকৃতির কথা বলার পর, এখানে শ্রীকৃষ্ণ প্রাণের রহস্য বা ‘চেতনা’র কথা বলেছেন। এটিই হলো জগতের প্রাণশক্তি।

১. পরা প্রকৃতি বা চেতনা: মাটি-জল-বাতাস কেবল জড় পাথর হয়ে থাকত যদি না তার ভেতরে প্রাণের সঞ্চার হতো। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, ‘পরা প্রকৃতি’ হলো সেই চেতনা বা ‘জীবভূতাম্’ যা প্রতিটি প্রাণীর ভেতরে কাজ করছে। এটিই হলো আত্মার শক্তি। জড় জগত নিজে নিজে কাজ করতে পারে না, তাকে এই চেতনা শক্তিই চালনা করে। যেমন গাড়ির ইঞ্জিন হলো জড় (অপরা), কিন্তু ড্রাইভার হলো চেতনা (পরা)।

২. জগত ধারক শক্তি: ‘যয়েদং ধার্যতে জগৎ’—অর্থাৎ এই জীবশক্তিই পুরো ব্রহ্মাণ্ডকে ধরে রেখেছে। যদি চেতনা না থাকত, তবে জগতের অস্তিত্বের কোনো অর্থ থাকত না। আমাদের প্রতিটি নিশ্বাস, প্রতিটি চিন্তা এই পরা প্রকৃতির ফল। এটি আমাদের শেখায় যে আমরা কেবল হাড়-মাংসের শরীর নই, আমরা সেই দিব্য চেতনারই অংশ যা ঈশ্বর থেকে এসেছে।

৩. মহাবাহো সম্বোধন: কৃষ্ণ অর্জুনকে ‘মহাবীর’ বলে সম্বোধন করেছেন। তিনি তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে তাঁর ভেতরের এই বীরত্ব আসলে সেই পরা প্রকৃতিরই প্রকাশ। মানুষের গৌরব তাঁর শরীরে নয়, বরং তাঁর ভেতরের সেই অবিনাশী শক্তিতে যা সরাসরি ঈশ্বরের সাথে যুক্ত।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের জীবনের প্রকৃত মূল্য বোঝায়। এটি আমাদের শেখায় যে আমরা প্রকৃতির চেয়েও উচ্চতর। জড় জগত আমাদের জন্য তৈরি হয়েছে, আমরা জড় জগতের জন্য নই। যখন আমরা বুঝতে পারি যে আমরা ঈশ্বরের পরা প্রকৃতির অংশ, তখন আমাদের সব ভয় ও হীনম্মন্যতা দূর হয়ে যায়। এটি এক পরম আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয়।