॥ অধ্যায় ৭, শ্লোক ৬ ॥

এতদ্যোনীনি ভূতানি সর্বাণীত্যুপধারয় ।
অহং কৃৎস্নস্য জগতঃ প্রভবঃ প্রলয়স্তথা ॥ ৭.৬ ॥

সরল ভাবার্থ:

জেনে রেখো, সমস্ত সৃষ্টি এই দুই প্রকৃতির (জড় ও চেতনা) সংযোগ থেকেই উৎপন্ন হয়েছে। আমিই সমগ্র জগতের উৎপত্তি এবং প্রলয়ের (ধ্বংসের) মূল কারণ।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

এই শ্লোকটি শ্রীকৃষ্ণের পরমেশ্বর হওয়ার এবং সমগ্র সৃষ্টির আধার হওয়ার এক অমোঘ ঘোষণা। এখানে তিনি নিজেকে ‘আলফা ও ওমেগা’ অর্থাৎ শুরু এবং শেষ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।

১. সৃষ্টির উৎস: এই জগতের স্থাবর-জঙ্গম যা কিছু আমরা দেখি—মানুষ, প্রাণী, পাহাড়, সমুদ্র—সবকিছুর মূল হলো জড় ও চেতন প্রকৃতির মিলন। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন তিনিই সেই মিলনের সূত্রপাত ঘটান। তাঁর বাইরে কোনো সৃষ্টি নেই। ‘এতদ্যোনীনি’ মানে হলো এই দুই প্রকৃতিই হলো সমস্ত সৃষ্টির জরায়ু বা উৎস। এর মাধ্যমে কৃষ্ণ বুঝিয়ে দিলেন যে জগত কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি এক পরম পরিকল্পনার অংশ।

২. প্রভব ও প্রলয়: জগতের জন্মও কৃষ্ণে, আবার এর ধ্বংসও কৃষ্ণে। যেমন সমুদ্র থেকে ঢেউ ওঠে আবার সমুদ্রেই মিশে যায়, জগতও তেমনি পরমাত্মা থেকে উৎপন্ন হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর মধ্যেই বিলীন হয়। এই সত্যটি আমাদের শেখায় যে কোনো কিছু হারানো বা মৃত্যুতে শোক করা বৃথা, কারণ সবকিছুই শেষ পর্যন্ত তাঁর কাছে ফিরে যাচ্ছে।

৩. একমেবাদ্বিতীয়ম্: এই শ্লোকটি একেশ্বরবাদের চূড়া। শ্রীকৃষ্ণ এখানে পরিষ্কার করেছেন যে জগতের পেছনে কোনো দ্বিতীয় শক্তি নেই। তিনিই একমাত্র কর্তা। আমাদের জীবনে যা কিছু ঘটছে, তার পেছনে সেই এক পরম সত্য কাজ করছে। এটি আমাদের মনকে শান্ত করে এবং আমাদের এক অটল বিশ্বাসের দিকে নিয়ে যায়।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের শ্রদ্ধার উদ্রেক করে। এটি আমাদের শেখায় যে পরমেশ্বর আমাদের থেকে দূরে কোথাও নেই, তিনি আমাদের জন্মের কারণ এবং তিনিই আমাদের শেষ আশ্রয়। যখন আমরা বুঝতে পারি যে আমরা ঈশ্বরের মাঝেই বাস করছি, তখন জগতের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। এটি আমাদের প্রতিটি প্রাণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায়।