সাধিভূতধিদৈবং মাং সাধিযজ্ঞং চ যে বিদুঃ ।
প্রয়াণকালেঽপি চ মাং তে বিদুর্যুক্তচেতসঃ ॥ ৭.৩০ ॥
সরল ভাবার্থ:
যাঁরা আমাকে অধিভূত (জড় জগত), অধিদৈব (দেবতা) এবং অধিযজ্ঞের (যজ্ঞের ভোক্তা) আধার হিসেবে জানেন, তাঁরা আমাতে মন স্থির রেখে মৃত্যুকালেও (প্রয়াণকালে) আমাকেই স্মরণ করতে পারেন।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:
সপ্তম অধ্যায়ের এই শেষ শ্লোকটি পরবর্তী অষ্টম অধ্যায়ের (অক্ষরব্রহ্ম যোগ) প্রবেশদ্বার। এটি জীবনের সবচেয়ে বড় মুহূর্ত—মৃত্যুর প্রস্তুতি সম্পর্কে আমাদের শিক্ষা দেয়।
১. সর্বাত্মক জ্ঞান: এখানে তিনটি পারিভাষিক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে—অধিভূত (সব জাগতিক বস্তু), অধিদৈব (সব অলৌকিক শক্তি) এবং অধিযজ্ঞ (সব কর্ম ও ত্যাগের ফল)। কৃষ্ণ বলছেন এই সবকিছুর পেছনেই তিনি আছেন। যখন একজন ভক্ত দেখেন যে জগতের প্রতিটি অণু-পরমাণু এবং প্রতিটি ঘটনা কৃষ্ণেরই লীলা, তখনই তাঁর জ্ঞান পূর্ণ হয়। তিনি জগতকে ঈশ্বর থেকে আলাদা দেখেন না।
২. প্রয়াণকালের স্মৃতি: মানুষের জীবনের পরীক্ষা হয় তাঁর অন্তিম মুহূর্তে। মৃত্যুর সময় শরীর যখন অসাড় হয় এবং যন্ত্রণায় মন আচ্ছন্ন থাকে, তখন সাধারণ মানুষের পক্ষে ভগবানকে মনে করা অসম্ভব। কিন্তু যিনি সারা জীবন কৃষ্ণের চিন্তায় ডুবে ছিলেন (‘যুক্তচেতসঃ’), তাঁর অবচেতন মন মৃত্যুকালেও কৃষ্ণকেই স্মরণ করে। আর মৃত্যুকালে যা স্মরণ করা হয়, পরের জন্ম এবং গতি সে অনুযায়ীই হয়।
৩. সাফল্যের শিখর: সপ্তম অধ্যায়ের সারকথা হলো শ্রীকৃষ্ণকে পূর্ণরূপে চেনা। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে ভক্তি কেবল অবসরের কাজ নয়, এটি হলো জীবনের অন্তিম মুহূর্তের পাথেয়। আমরা যদি এখন থেকে অভ্যাস না করি, তবে শেষ সময়ে তাঁকে মনে করা যাবে না। এটি আমাদের প্রতিটি মুহূর্তকে সার্থক করার প্রেরণা দেয়।
ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের মৃত্যুর ভয় থেকে মুক্তি দেয়। এটি আমাদের শেখায় যে সারাজীবনের সাধনা কীভাবে মৃত্যুঞ্জয়ী শক্তিতে পরিণত হয়। সপ্তম অধ্যায়ের এই সমাপ্তি আমাদের এক উন্নততর চেতনার দিকে নিয়ে যায়। শ্রীকৃষ্ণের এই বাণী আমাদের মনে এক গভীর আশ্বাস দেয় যে তিনি আমাদের এই জন্ম তো বটেই, এমনকি মৃত্যুর ওপারেও আমাদের সাথেই আছেন।