॥ অধ্যায় ৭, শ্লোক ১৭ ॥

তেষাং জ্ঞানী নিত্যযুক্ত একভক্তিবিশিষ্যতে ।
প্রিয়ো হি জ্ঞানিনোঽত্যর্থমহং স চ মম প্রিয়ঃ ॥ ৭.১৭ ॥

সরল ভাবার্থ:

এই চার প্রকার ভক্তের মধ্যে একনিষ্ঠ ভক্তিযুক্ত জ্ঞানীই শ্রেষ্ঠ। কারণ আমি জ্ঞানীর অত্যন্ত প্রিয় এবং তিনিও আমার অত্যন্ত প্রিয়।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

আগের শ্লোকের ধারাবাহিকতায় শ্রীকৃষ্ণ এখানে শ্রেষ্ঠ ভক্তের পরিচয় দিয়েছেন। কেন জ্ঞানী ভক্ত কৃষ্ণের সবচেয়ে কাছের, তার কারণ এখানে স্পষ্ট করা হয়েছে।

১. একভক্তি ও নিত্যযুক্ত: জ্ঞানী ভক্তের মন অন্য কোথাও বিক্ষিপ্ত হয় না। তাঁর ভক্তি হলো ‘একভক্তি’ অর্থাৎ কেবল কৃষ্ণের জন্য। তিনি সবসময় ভগবানের সাথে যুক্ত থাকেন (‘নিত্যযুক্ত’)। অন্যান্য ভক্তরা বিপদ কাটলে বা সম্পদ পেলে হয়তো ভগবানকে ভুলে যেতে পারেন, কিন্তু জ্ঞানী ভক্ত জানেন যে ভগবান ছাড়া আর কোনো গতি নেই। এই একনিষ্ঠতাই তাঁকে সবার থেকে আলাদা করে।

২. পরস্পর প্রেম: ‘প্রিয়ো হি জ্ঞানিনোঽত্যর্থ’—অর্থাৎ জ্ঞানী ভক্তের কাছে ভগবান কেবল এক দেবমূর্তি নন, তিনি তাঁর জীবনের প্রাণ। তেমনি ভগবানও সেই ভক্তকে তাঁর হৃদয়ে স্থান দেন। এই প্রেম কোনো শর্তের ওপর ভিত্তি করে নয়। এটি দুই আত্মার একাত্ম হওয়া। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে ভক্তি কেবল আচার নয়, এটি একটি গভীর ব্যক্তিগত প্রেম।

৩. শ্রেষ্ঠত্বের কারণ: জ্ঞানীর ভক্তি শুরু হয় সত্য জানার পর থেকে। তিনি জানেন যে কৃষ্ণই পরম সত্য। তাঁর ভক্তি অটল এবং গভীর। আমরা যখন কাউকে জেনে-বুঝে ভালোবাসি, সেই ভালোবাসা অনেক বেশি স্থায়ী হয়। শ্রীকৃষ্ণ এই গভীর প্রেমকেই ‘বিশিষ্যতে’ বা বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের ভক্তির লক্ষ্য ঠিক করতে সাহায্য করে। এটি আমাদের শেখায় যে আধ্যাত্মিকতার চরম শিখর হলো ভগবানের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলা। যখন আমরা বুঝতে পারি যে ঈশ্বর আমাদের সবচেয়ে বড় বন্ধু এবং একমাত্র আশ্রয়, তখনই আমরা জ্ঞানীর স্তরে উন্নীত হই। এটি এক পরম আনন্দের রাজপথ।