॥ অধ্যায় ৭, শ্লোক ১ ॥

শ্রীভগবানুবাচ ।
ময্যাসক্তমনাঃ পার্থ যোগং যুঞ্জন্মদাশ্রয়ঃ ।
অসংশয়ং সমগ্রং মাং যথা জ্ঞাস্যসি তচ্ছৃণু ॥ ৭.১ ॥

সরল ভাবার্থ:

শ্রীভগবান বললেন—হে পার্থ! আমাতে আসক্ত হয়ে এবং আমারই আশ্রিত হয়ে যোগ অভ্যাস করলে তুমি যেভাবে আমাকে সম্পূর্ণভাবে এবং সংশয়হীনভাবে জানতে পারবে, তা শোনো।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

সপ্তম অধ্যায়ের এই প্রথম শ্লোকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি ভক্তি ও জ্ঞানের এক মেলবন্ধন তৈরি করে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে অর্জুনকে বলছেন কীভাবে তাঁকে 'সমগ্র' বা পূর্ণরূপে চেনা যায়।

১. ময্যাসক্তমনাঃ বা ঈশ্বরে আসক্তি: সাধারণত আমরা আমাদের পরিবার, সম্পত্তি বা কাজের প্রতি আসক্ত থাকি। আসক্তি মানে হলো মনের এমন টান যা আমাদের সেই বিষয়ের কথা বারবার মনে করিয়ে দেয়। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, এই আসক্তিকে জগত থেকে সরিয়ে যদি আমার (ঈশ্বরের) দিকে ফেরাতে পারো, তবেই তুমি প্রকৃত জ্ঞানের যোগ্য হবে। মনকে যখন ভগবানের দিকে ফেরানো হয়, তখন তা পবিত্র হতে শুরু করে। এটি হলো যোগের প্রথম ধাপ—মনের অভিমুখ পরিবর্তন করা।

২. মদাশ্রয়ঃ বা ঈশ্বরের আশ্রয়: অনেকে কেবল নিজের শক্তিতে যোগ অভ্যাস করতে চান, যা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু কৃষ্ণ বলছেন ‘মদাশ্রয়ঃ’ অর্থাৎ আমার আশ্রয় নাও। এর অর্থ হলো নিজেকে ভগবানের হাতে সঁপে দেওয়া। যখন আমরা বিশ্বাস করি যে ভগবানই আমাদের চালাচ্ছেন, তখন আমাদের অহংকার কমে যায় এবং সাধনা সহজ হয়। এটি হলো এক প্রকারের পরম নির্ভরতা, যেখানে সাধক জানেন যে তাঁর গন্তব্য এবং পথ দুটোই শ্রীকৃষ্ণ।

৩. অসংশয়ং সমগ্রং জ্ঞান: শ্রীকৃষ্ণ এখানে বলছেন যে তিনি অর্জুনকে এমন জ্ঞান দেবেন যা ‘অসংশয়ং’ অর্থাৎ কোনো সন্দেহ থাকবে না এবং ‘সমগ্রং’ অর্থাৎ যা পূর্ণাঙ্গ। সাধারণত আমরা ভগবানকে আংশিকভাবে জানি—কেউ মনে করে তিনি নিরাকার শক্তি, কেউ মনে করে তিনি সাকার দেবমূর্তি। কিন্তু কৃষ্ণ বলছেন যে তিনি অর্জুনকে তাঁর পরম স্বরূপ বোঝাবেন, যা জানলে আর কিছুই জানার বাকি থাকে না।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে আধ্যাত্মিকতা কেবল কোনো থিওরি নয়, এটি একটি জীবন্ত অনুভূতি। যখন আমরা আমাদের ভালোবাসা ও আশ্রয় শ্রীকৃষ্ণের চরণে রাখি, তখন তিনি নিজেই আমাদের হৃদয়ে জ্ঞানের আলো জ্বেলে দেন। এটি হলো একটি সুনিশ্চিত আধ্যাত্মিক যাত্রার শুরু।