॥ অধ্যায় ৭, শ্লোক ২ ॥

জ্ঞানং তেঽহং সবিজ্ঞানমিদং বক্ষ্যাম্যশেষতঃ ।
যজ্জ্ঞাত্বা নেহ ভূয়োহন্যজ্জ্ঞাতব্যমবশিষ্যতে ॥ ৭.২ ॥

সরল ভাবার্থ:

আমি তোমাকে অভিজ্ঞতালব্ধ পরম জ্ঞানের (বিজ্ঞান) কথা বলব, যা জানলে এই জগতে তোমার আর কিছুই জানার বাকি থাকবে না।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

এই শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ ‘জ্ঞান’ এবং ‘বিজ্ঞান’-এর মধ্যে পার্থক্য বুঝিয়ে দিয়েছেন। এটি আধ্যাত্মিক গবেষণার এক চরম উচ্চতা।

১. জ্ঞান বনাম বিজ্ঞান: ‘জ্ঞান’ বলতে সাধারণত শাস্ত্রীয় জ্ঞান বা তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বোঝায়। যেমন আমরা পড়ি যে ঈশ্বর সর্বত্র আছেন—এটি জ্ঞান। কিন্তু ‘বিজ্ঞান’ হলো সেই জ্ঞানের প্রয়োগ বা সরাসরি অনুভব করা। যখন একজন সাধক অনুভব করেন যে সত্যিই প্রতিটি ধূলিকণায় ঈশ্বর আছেন, তখন সেই জ্ঞান ‘বিজ্ঞানে’ রূপান্তরিত হয়। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন তিনি অর্জুনকে এমন বাস্তব জ্ঞান দেবেন যা কেবল কথার কথা নয়, বরং এক পরম উপলব্ধি।

২. অশেষতঃ বা পূর্ণ জ্ঞান: কৃষ্ণ বলছেন তিনি এই তত্ত্ব ‘অশেষতঃ’ বা পুরোপুরি বলবেন। জগতের অন্য সব বিদ্যা হলো আংশিক। যেমন গণিত বা বিজ্ঞান আমাদের জগতের একটা দিক শেখায়। কিন্তু অধ্যাত্মবিদ্যা আমাদের সমগ্র অস্তিত্বের রহস্য শেখায়। কৃষ্ণ দাবি করছেন যে এটি জানলে আর কিছুই জানার বাকি থাকে না। কারণ এই জগত ঈশ্বরেরই রূপান্তর, তাই ঈশ্বরকে জানা মানে জগতকে তার উৎসমূল থেকে জানা।

৩. পরম তৃপ্তি: মানুষের মনে কৌতূহলের শেষ নেই। আমরা সারাজীবন নতুন নতুন জিনিস জানতে চাই। কিন্তু কৃষ্ণ বলছেন এমন এক বিন্দু আছে যেখানে পৌঁছালে সব জিজ্ঞাসার শেষ হয়। এটি হলো সেই মহাসত্য যা জানলে মানুষের মন চিরকালের জন্য শান্ত হয়ে যায়। এটি কেবল তথ্য নয়, এটি হলো জীবনের চরম সার্থকতা।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের জ্ঞানের প্রকৃত লক্ষ্যের কথা বলে। আমরা জ্ঞানার্জন করি কেবল জীবিকার জন্য নয়, বরং আমাদের আত্মার মুক্তির জন্য। শ্রীকৃষ্ণের দেওয়া এই জ্ঞান আমাদের অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে মুক্তি দেয় এবং এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যায় যেখান থেকে এই জগতকে একদম অন্যরূপে দেখা যায়। এটিই হলো প্রকৃত প্রজ্ঞা।