॥ অধ্যায় ৭, শ্লোক ৩ ॥

মনুষ্যাণাং সহস্রেষু কশ্চিদ্যততি সিদ্ধয়ে ।
যততামপি সিদ্ধানাং কশ্চিন্মাং বেত্তি তত্ত্বতঃ ॥ ৭.৩ ॥

সরল ভাবার্থ:

হাজার হাজার মানুষের মধ্যে খুব কম লোকই সিদ্ধি বা আত্মজ্ঞানের জন্য চেষ্টা করেন। আর সেই সব চেষ্টাশীল ব্যক্তিদের মধ্যেও খুব কম লোকই আমাকে প্রকৃত তত্ত্ব অনুসারে জানতে পারেন।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

এই শ্লোকটি আধ্যাত্মিক পথের দুর্লভতা এবং কঠিন সংগ্রামের কথা মনে করিয়ে দেয়। এটি আমাদের সতর্ক করে যে সত্যের পথ অনেক সংকীর্ণ।

১. সিদ্ধির জন্য প্রচেষ্টা: পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ খাওয়া-দাওয়া, ঘুম এবং জাগতিক সুখের পেছনেই জীবন কাটিয়ে দেয়। হাজার হাজার মানুষের মধ্যে হয়তো একজন ভাবেন যে জীবনের উদ্দেশ্য কী? কে আমি? কোথা থেকে এসেছি? শ্রীকৃষ্ণ বলছেন এই প্রশ্ন করা এবং তার সমাধানের জন্য চেষ্টা করা মানুষের প্রথম বড় ধাপ। আধ্যাত্মিকতা কোনো হুজুগ নয়, এটি একটি তীব্র আকাঙ্ক্ষা।

২. তত্ত্বত জানার বিরলতা: যারা চেষ্টা শুরু করেন, তাদের মধ্যেও অনেকে মাঝপথে থেমে যান অথবা ভুল পথে চলেন। অনেকে ঈশ্বরকে কেবল ভয় বা প্রলোভন থেকে ভজনা করেন। কিন্তু ‘তত্ত্বতঃ’ অর্থাৎ ঈশ্বর কী এবং তাঁর স্বরূপ কী—তা জানার জন্য যে গভীর ধ্যান ও বৈরাগ্য প্রয়োজন, তা খুব কম মানুষের মধ্যেই থাকে। কোটি মানুষের মধ্যে হয়তো একজন সেই চূড়ান্ত রহস্য ভেদ করতে পারেন।

৩. সাধনার গুরুত্ব: এই শ্লোকটি আমাদের অহংকার কমাতে সাহায্য করে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা যদি একটু আধ্যাত্মিক কাজ করি, তবে যেন মনে না করি আমরা সব পেয়ে গেছি। এটি এক দীর্ঘ যাত্রা। তবে এটি আমাদের হতাশ করার জন্য নয়, বরং আমাদের সজাগ রাখার জন্য বলা হয়েছে। ঈশ্বরকে জানা এক দুষ্কর কাজ, তাই এর জন্য চাই অসীম ধৈর্য ও নিষ্ঠা।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে আধ্যাত্মিকতা মাপা যায় না। সত্যের পথে সাথী কম থাকে। কিন্তু সেই বিরলদের দলেই আমাদের শামিল হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে অর্জুনকে সেই ‘কশ্চিৎ’ বা বিরল ব্যক্তিদের একজন হতে উৎসাহ দিচ্ছেন। এটি হলো নিজেকে শ্রেষ্ঠ করে তোলার এক পরম আহ্বান।

সাধারণ মানুষ দৃশ্যমান জগত নিয়ে ব্যস্ত, অসাধারণ মানুষ অদৃশ্য সত্যের সন্ধানে লিপ্ত, আর সার্থক মানুষ সেই সত্যকে সরাসরি দর্শন করেন।