কামৈস্তৈস্তৈর্হৃতজ্ঞানাঃ প্রপদ্যন্তেঽন্যদেবতাঃ ।
তং তং নিয়মমাস্তায় প্রকৃত্যা নিয়তাঃ স্বয়া ॥ ৭.২০ ॥
সরল ভাবার্থ:
যাঁদের বিচারবুদ্ধি বিভিন্ন জাগতিক কামনার দ্বারা অপহৃত হয়েছে, তাঁরা নিজেদের স্বভাবের বশবর্তী হয়ে বিভিন্ন নিয়ম পালন করেন এবং অন্যান্য দেবতাদের শরণাপন্ন হন।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:
শ্রীকৃষ্ণ এখানে কেন মানুষ মূল পরমেশ্বরকে ছেড়ে বিভিন্ন দেবী-দেবতার পেছনে দৌড়ায়, তার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। এটি ধর্মীয় মনস্তত্ত্বের এক গভীর বিশ্লেষণ।
১. কামৈস্তৈস্তৈর্হৃতজ্ঞানাঃ: মানুষের কামনার কোনো শেষ নেই। কেউ চাকরি চায়, কেউ বিয়ে করতে চায়, কেউ জয় চায়। এই প্রবল ইচ্ছা বা ‘কাম’ মানুষের জ্ঞানকে ঢেকে দেয়। তখন সে ভুলে যায় যে সবকিছুর উৎস একজনই। সে মনে করে অমুক দেবতার পূজা করলে তাড়াতাড়ি ফল পাওয়া যাবে। এই চঞ্চলতা এবং ধৈর্যের অভাবই মানুষকে মূল পথ থেকে বিচ্যুত করে।
২. অন্যদেবতা ও নিয়ম: শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে অন্যান্য দেবতারাও তাঁরই বিভিন্ন শক্তির রূপান্তর। কিন্তু যারা কেবল জাগতিক ফলের আশায় তাঁদের পূজা করে, তারা ওই ফলেই আটকে থাকে। তারা বিভিন্ন ব্রত বা নিয়ম পালন করে কেবল কিছু ক্ষণস্থায়ী সুবিধার জন্য। এটি এক প্রকারের আধ্যাত্মিক ব্যবসা। কৃষ্ণ আমাদের শেখাতে চান যে সরাসরি উৎসকে ডাকলে শাখা-প্রশাখা এমনিতেই জল পায়।
৩. প্রকৃতি ও স্বভাব: মানুষ তাঁর আগের জন্মের স্বভাব বা সংস্কারের বশবর্তী হয়েই এই কাজগুলো করে। তাঁর মনের গঠন তাকে সহজ ও চটকদার ফলের দিকে নিয়ে যায়। এটি আমাদের শেখায় যে আমাদের স্বভাবকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং বুদ্ধিকে সবসময় পরমাত্মার দিকে স্থির রাখতে হবে।
ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের একনিষ্ঠতার শিক্ষা দেয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে গাছকে জল দিতে হলে গোড়ায় জল দিতে হয়, পাতায় পাতায় ঢাললে গাছ বাঁচে না। তেমনি সব শক্তির উৎস শ্রীকৃষ্ণকে ডাকলে সব দেবতাই সন্তুষ্ট হন। এটি আমাদের ধর্মের মূল লক্ষ্যের দিকে ফিরে আসার এক আহ্বান। এই একনিষ্ঠতাই আমাদের মুক্তির পথে নিয়ে যায়।