বলং বলবতাং চাহং কামরাগবিবর্জিতম্ ।
ধর্মাবিরুদ্ধো ভূতেষু কামোঽস্মি ভরতষভ ॥ ৭.১১ ॥
সরল ভাবার্থ:
হে ভরতশ্রেষ্ঠ! আমি বলবানদের কাম ও আসক্তিহীন বল এবং প্রাণীদের মধ্যে ধর্মসম্মত কাম বা ইচ্ছা।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:
এই শ্লোকটি শক্তি এবং ইচ্ছার এক অপূর্ব আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা দেয়। শ্রীকৃষ্ণ এখানে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে জাগতিক আবেগগুলো যখন শুদ্ধ হয়, তখন তার মধ্যেও ঈশ্বরকে পাওয়া যায়।
১. কামরাগবিবর্জিত বল: সাধারণত শক্তি বা ‘বল’ থাকলে মানুষের মনে অহংকার এবং আসক্তি (রাগ) আসে। কিন্তু কৃষ্ণ বলছেন, যে বল কেবল ন্যায়ের জন্য এবং যা ব্যক্তিগত স্বার্থ বা আসক্তি মুক্ত, সেই শক্তিই হলো তিনি। একজন বীর যখন দম্ভ ছাড়াই দুর্বলকে রক্ষা করেন, তখন তাঁর সেই পবিত্র শক্তির আধার স্বয়ং ভগবান। এটি আমাদের শেখায় যে শক্তি অর্জন করা দোষের নয়, কিন্তু সেই শক্তিকে আসক্তি ও অহংকার মুক্ত রাখা হলো আসল যোগ।
২. ধর্মাবিরুদ্ধ কাম: ‘কাম’ বা ইচ্ছাকে সাধারণত আধ্যাত্মিকতার শত্রু মনে করা হয়। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ এক বৈপ্লবিক কথা বলেছেন—‘ধর্মাবিরুদ্ধো... কামোঽস্মি’। অর্থাৎ যে ইচ্ছা ধর্মের পথে চলে, যা সৃষ্টির নিয়মের পরিপন্থী নয়, সেই ইচ্ছাই হলো ঈশ্বর। যেমন বংশ রক্ষার জন্য সন্তান কাম বা সত্য প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা। এটি আমাদের শেখায় যে জগত ত্যাগ করা নয়, বরং জগতের ইচ্ছাগুলোকে ধর্মের সাথে যুক্ত করাই হলো প্রকৃত ভক্তি।
৩. ভরতষভ সম্বোধন: কৃষ্ণ অর্জুনকে ভরতবংশের শ্রেষ্ঠ বীর বলে ডাকছেন। অর্জুন যুদ্ধের ময়দানে যে শক্তি প্রদর্শন করছেন, কৃষ্ণ তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে এই শক্তি যেন অহংকার বা ক্রোধের বশবর্তী না হয়। এটি যখন ধর্মের জন্য প্রযুক্ত হবে, তখনই তা দিব্য শক্তিতে পরিণত হবে।
ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের নৈতিকতার পাঠ দেয়। এটি আমাদের শেখায় যে আমাদের দৈহিক শক্তি এবং মনের ইচ্ছাগুলো যদি শুদ্ধ থাকে, তবে আমরাও আমাদের কর্মের মাঝে ভগবানকে অনুভব করতে পারি। ঈশ্বর কেবল মন্দিরে নন, তিনি আমাদের প্রতিটি ন্যায়সঙ্গত কর্মের শক্তিতে বিদ্যমান। এটি এক গভীর আত্মশুদ্ধির পথ।