॥ অধ্যায় ৭, শ্লোক ১২ ॥

যে চৈব সাত্ত্বিকা ভাবা রাজসাস্তামসাশ্চ যে ।
মত্ত এবেতি তান্ বিদ্ধি ন ত্বহং তেষু তে ময়ি ॥ ৭.১২ ॥

সরল ভাবার্থ:

সত্ত্ব, রজ ও তম—এই তিন গুণ থেকে উৎপন্ন সমস্ত ভাব আমা হতেই উৎপন্ন বলে জানবে। কিন্তু আমি তাদের অধীন নই, বরং তারা আমারই অধীন (আমাতে অবস্থিত)।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

এই শ্লোকটি ঈশ্বর ও প্রকৃতির গুণত্রয়ের সম্পর্কের এক চূড়ান্ত রহস্য উন্মোচন করে। এটি আমাদের ত্রিগুণের জট বুঝতে সাহায্য করে।

১. ত্রিগুণের উৎস: জগতের প্রতিটি মানুষ ও বস্তু এই তিনটি গুণের কোনো না কোনোটির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সত্ত্বগুণ (শান্তি ও জ্ঞান), রজোগুণ (চঞ্চলতা ও কর্ম) এবং তমোগুণ (অলসতা ও অজ্ঞানতা)। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে এই সবকটি গুণেরই মূল উৎস তিনি নিজে। তাঁর ইচ্ছা ও শক্তি ছাড়া প্রকৃতির এই বিচিত্র খেলা সম্ভব হতো না।

২. নির্লিপ্ত পরমেশ্বর: যদিও সব গুণ কৃষ্ণ থেকে আসে, কিন্তু তিনি বলছেন ‘ন ত্বহং তেষু’। অর্থাৎ তিনি এই গুণগুলোর দ্বারা প্রভাবিত হন না। যেমন সূর্যের আলোয় কেউ ভালো কাজ করে, কেউ খারাপ—কিন্তু সূর্য তাতে লিপ্ত হয় না। তেমনি ঈশ্বর সব কিছুর স্রষ্টা হয়েও সব কিছুর ঊর্ধ্বে। আমরা এই তিন গুণের অধীনে থেকে সুখ-দুঃখ ভোগ করি, কিন্তু ঈশ্বর এই সবের পরম নিয়ন্ত্রক হয়েও মুক্ত।

৩. তে ময়ি: প্রকৃতি কৃষ্ণের আশ্রয়ে আছে, কৃষ্ণ প্রকৃতির আশ্রয়ে নেই। এই জগত তাঁর এক ছোট অংশ মাত্র। এটি আমাদের শেখায় যে আমরা যখন এই গুণগুলোর মায়ায় আটকে যাই, তখন আমাদের উচিত সেই পরমাত্মার দিকে তাকানো যিনি এই সবের ঊর্ধ্বে। এই উপলব্ধিতাই আমাদের মায়ার বন্ধন থেকে মুক্তির পথ দেখায়।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের মানসিক স্থিতির শিক্ষা দেয়। আমরা যখন রাগ বা অলসতায় ভুগি, তখন বুঝতে হবে আমরা প্রকৃতির গুণের অধীন হয়েছি। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই নির্লিপ্ত পরমেশ্বরের মতো হওয়া যিনি সবকিছুর স্রষ্টা হয়েও সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থির থাকেন। এটিই হলো প্রকৃত স্বাধীনতা।