লোভঃ প্রবৃত্তিরারম্ভঃ কর্মণামশমঃ স্পৃহা ।
রজস্যেতানি জায়ন্তে বিবৃদ্ধে ভরতর্ষভ ॥ ১৪.১২ ॥
সরল ভাবার্থ:
হে ভরতশ্রেষ্ঠ অর্জুন! রজ গুণ বৃদ্ধি পেলে লোভ, কর্মে প্রবৃত্তি, স্বার্থপর কর্মের উদ্যম, অস্থিরতা এবং বিষয়ের প্রতি লালসা উৎপন্ন হয়।
বিস্তারিত বিশ্লেষণ:
সত্ত্ব গুণের পর কৃষ্ণ এবার রজ গুণের লক্ষণগুলো বর্ণনা করছেন। তিনি বলছেন, রজ গুণ যখন প্রবল হয়, তখন মানুষের মধ্যে লোভ বা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বেড়ে যায়। সে তখন শান্ত হয়ে বসতে পারে না, তার মধ্যে প্রবৃত্তি বা নিরন্তর কাজের ঝোঁক দেখা দেয়। সে আরম্ভঃ কর্মণাম বা নতুন নতুন প্রজেক্ট শুরু করতে চায়, কিন্তু তার পেছনে মূল উদ্দেশ্য থাকে ব্যক্তিগত লাভ। রজ গুণের সবথেকে বড় লক্ষণ হলো অশমঃ বা মানসিক অস্থিরতা। রজগুণী মানুষের মন অনেকটা অশান্ত সমুদ্রের মতো, যেখানে কামনার ঢেউ আছড়ে পড়ে।
বিস্তারিতভাবে দেখলে, রজ গুণ হলো বর্তমান আধুনিক যুগের চালিকাশক্তি। আমরা যে সারাক্ষণ প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে (Rat Race) শামিল হই, তার মূলে রয়েছে এই রজ গুণ। এটি আমাদের শেখায় যে আরও চাই, আরও ভালো হতে হবে, অন্যদের হারাতে হবে। কৃষ্ণ অর্জুনকে ভরতর্ষভ বা ভরতবংশের শ্রেষ্ঠ বলে সম্বোধন করছেন—যাতে অর্জুন বুঝতে পারেন যে একজন শ্রেষ্ঠ বীরের জন্য এই অস্থিরতা মানায় না। রজ গুণ মানুষকে কর্মের নেশায় মত্ত করে কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে ক্লান্ত ও অতৃপ্ত করে ফেলে। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে আমাদের উদ্যম যদি কেবল ব্যক্তিগত লালসা বা স্পৃহা থেকে আসে, তবে তা আমাদের কেবল অশান্তিই দেবে। শ্রীকৃষ্ণের এই বাণী আমাদের মনের আয়নায় আমাদেরই প্রতিচ্ছবি দেখায়।
এই বিশ্লেষণের গভীরে গেলে দেখা যায়, কৃষ্ণ এখানে রজ গুণের একটি 'সাইকোলজিক্যাল প্রোফাইল' তৈরি করেছেন। আমরা যখন কোনো কাজে খুব বেশি আসক্ত হয়ে পড়ি এবং ফল নিয়ে দুশ্চিন্তা করি, তখন বুঝতে হবে রজ গুণ আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে। শ্রীকৃষ্ণের এই পরম বিজ্ঞান আমাদের জড় জগতের মায়া কাটিয়ে সত্যের এক পরম বিশালতায় নিয়ে যায়। এটিই হলো রজ গুণের সেই জ্বলন্ত দহন যা থেকে মুক্তি পেতে গেলে সত্ত্ব গুণের শীতলতা প্রয়োজন। এই শ্লোকটি আমাদের জীবনের লক্ষ্য পুনর্নির্ধারণ করতে সাহায্য করে। যখন আমরা আমাদের কর্মকে স্বার্থমুক্ত করি, তখনই আমরা রজ গুণের এই অস্থির বন্ধন থেকে মুক্তি পেতে শুরু করি।
গভীর দার্শনিক তাৎপর্য ও তত্ত্ব বিশ্লেষণ :
দার্শনিক প্রেক্ষাপটে এই শ্লোকটি 'The Psychology of Unrest' বা অস্থিরতার মনোবিজ্ঞান। এখানে 'লোভ' এবং 'স্পৃহা' শব্দ দুটি মানুষের মনের অন্তহীন চাহিদাকে নির্দেশ করে। দার্শনিক বিচারে রজ গুণ হলো 'Rajo-Guna is the cause of Avidya-Kam-Karma' (অজ্ঞানতা-কামনা-কর্মের মূল কারণ)। এটি আত্মাকে বাহ্যিক জগতের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে।
উদাহরণস্বরূপ, একটি মরীচিকার কথা ভাবুন। তৃষ্ণার্ত হরিণ যেমন জলের আশায় মরুভূমিতে দৌড়ায় কিন্তু জল পায় না, রজগুণী মানুষও তেমনি বিষয়ের পেছনে দৌড়ে বেড়ায় কিন্তু স্থায়ী শান্তি পায় না। তাত্ত্বিকভাবে, এই শ্লোকটি নির্দেশ করে যে রজ গুণ হলো সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় 'Kinetic Energy', কিন্তু আধ্যাত্মিকতার জন্য এটি একটি বাধা। পাশ্চাত্য দর্শনে যেমন ফাউস্টীয়ান আকাঙ্ক্ষা (Faustian Ambition) বা নিরন্তর পাওয়ার ইচ্ছার কথা বলা হয়েছে, কৃষ্ণের এই বর্ণনা তার একটি আধ্যাত্মিক সমাধান দেয়।
তাত্ত্বিকভাবে, এই শ্লোকটি নির্দেশ করে যে প্রকৃত সুখ বস্তুর মধ্যে নয়, বরং মনের স্থিরতার মধ্যে নিহিত। অর্জুনের জন্য এই দর্শনটি ছিল অত্যন্ত কার্যকর কারণ তিনি যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে যে অস্থিরতায় ছিলেন, তা ছিল রজ গুণেরই বহিঃপ্রকাশ। কৃষ্ণ তাকে দেখালেন কীভাবে এই 'অশমঃ' বা অস্থিরতাকে জয় করতে হয়। এই দার্শনিক সত্যটি আমাদের শেখায় যে আমরা যত বেশি বাইরের বিষয়ের ওপর নির্ভর করব, তত বেশি আমরা রজ গুণের দাসে পরিণত হব। শ্রীকৃষ্ণের এই বর্ণনা আমাদের মায়ার পর্দা সরিয়ে সত্যের এক পরম শান্তিতে নিয়ে যায়। এটিই হলো রজ গুণের মায়াজাল চেনার উপায়।