॥ অধ্যায় ১৬, শ্লোক ১৭ ॥

আত্মসংভাবিতাঃ স্তব্ধা ধনমানমদান্বিতাঃ ।
যজন্তে নামযজ্ঞৈস্তে দম্ভেনাবিধিপূর্বকম্ ॥ ১৭ ॥

সরল ভাবার্থ

নিজেদের সর্বশ্রেষ্ঠ মনে করা (আত্মসংভাবিতাঃ), অনমনীয় বা উদ্ধত, এবং ধন ও মানের অহংকারে মত্ত সেই আসুরিক ব্যক্তিরা শাস্ত্রীয় বিধিবহির্ভূতভাবে কেবল লোকদেখানোর জন্য দম্ভের সাথে নামমাত্র যজ্ঞ অনুষ্ঠান করে।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এই শ্লোকে আসুরিক ব্যক্তিদের ধর্মের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। তিনি তাদের 'আত্মসংভাবিতাঃ' বলেছেন, যার অর্থ হলো যারা নিজেরাই নিজেদের সার্টিফিকেট দেয়, অর্থাৎ অন্যের গুণের তোয়াক্কা না করে নিজেকেই শ্রেষ্ঠ মনে করে। তারা 'স্তব্ধা' বা অত্যন্ত একরোখা ও অনমনীয়। ধন এবং সম্মানের মত্ততা তাদের এতটাই অন্ধ করে দেয় যে তারা মনে করে ধর্মের কাজগুলোকেও টাকা দিয়ে কেনা সম্ভব।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো 'নামযজ্ঞ'। এর অর্থ হলো কেবল নামে মাত্র যজ্ঞ করা, যার পেছনে কোনো ভক্তি বা শাস্ত্রীয় নিয়ম নেই। তারা যখন দান করে বা পুজো করে, তখন তাদের উদ্দেশ্য ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করা নয়, বরং সমাজে নিজের নাম ও প্রভাব বজায় রাখা। একেই বলা হয়েছে 'দম্ভেনাবিধিপূর্বকম্'—অর্থাৎ শাস্ত্রের কোনো নিয়ম বা বিধি (যেমন মনের শুদ্ধি, মন্ত্রের সঠিক উচ্চারণ বা পাত্রের যোগ্যতা) তারা মানে না। এই ধরনের লোকদেখানো ধর্মীয় আচরণ আসলে আধ্যাত্মিক অপরাধ। কারণ ধর্ম যেখানে বিনয় শেখায়, সেখানে তারা ধর্মকেই অহংকারের হাতিয়ার বানায়। এই শ্লোকটি আমাদের সতর্ক করে যে, ভক্তিহীন আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠান পরমাত্মার কাছে পৌঁছায় না। হৃদয়ের সরলতা ও শাস্ত্রীয় নিষ্ঠাই হলো প্রকৃত ধর্মের ভিত্তি। যারা কেবল বাইরের জৌলুস দিয়ে ধর্ম করতে চায়, তারা আসলে আসুরিক প্রবৃত্তিরই শিকার।
তাত্ত্বিক গভীরতা: ভক্তি ছাড়া যজ্ঞ হলো প্রাণহীন শরীরের মতো। অহংকার যখন পূজার বেদিতে বসে, তখন সেই পূজা আর পূজা থাকে না, তা হয়ে দাঁড়ায় আত্মপূজা বা দম্ভ। ভগবান কেবল শুদ্ধ ভাব গ্রহণ করেন, বাহ্যিক ঐশ্বর্য নয়।