॥ অধ্যায় ১৬, শ্লোক ২১ ॥

ত্রিবিধং নরকস্যেদং দ্বারং নাশনমাত্মনঃ ।
কামঃ ক্রোধস্তথা লোভস্তস্মাদেতত্রয়ং ত্যজেৎ ॥ ২১ ॥

সরল ভাবার্থ

কাম, ক্রোধ এবং লোভ—এই তিনটি হলো নরকের দ্বার, যা আত্মার বিনাশ ঘটায়। তাই এই তিনটি অবশ্যই বর্জন করা উচিত।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এই শ্লোকটি সমগ্র গীতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ। শ্রীকৃষ্ণ এখানে সরাসরি 'কাম' (অদম্য বাসনা), 'ক্রোধ' (রাগ) এবং 'লোভ'—এই তিনটিকে আত্মার শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি এগুলোকে 'নরকের দ্বার' বলেছেন কারণ এই তিনটি প্রবৃত্তিই মানুষকে আসুরিক কাজের দিকে ঠেলে দেয়। কাম থেকে কামনার অতৃপ্তি জন্মে, যা থেকে ক্রোধের উৎপত্তি হয়, আর সেই ক্রোধ মানুষকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়। অন্যদিকে লোভ মানুষকে অন্যায় পথে সম্পদ আহরণে প্ররোচিত করে।

ভগবান বলছেন এই তিনটি 'নাশনমাত্মনঃ' অর্থাৎ আত্মার অধঃপতন ঘটায়। এখানে নরক কেবল মৃত্যুর পরের কোনো স্থান নয়, বরং একটি অশান্ত ও কদর্য মানসিক অবস্থা। একজন কামার্ত, ক্রোধী বা লোভী ব্যক্তি জীবিত অবস্থাতেই নরকের যন্ত্রণা ভোগ করে। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে এবং আমাদের সবাইকে নির্দেশ দিচ্ছেন—'তস্মাদেতত্রয়ং ত্যজেৎ' (তাই এই তিনটিকে ত্যাগ করো)। এই তিনটি ত্যাগ করার অর্থ হলো নিজের ইন্দ্রিয় ও মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। কামনার আগুন একবার জ্বললে তা সবকিছু পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। তাই যদি কেউ প্রকৃত সুখ এবং আধ্যাত্মিক মুক্তি চায়, তবে তাকে এই তিনটি বিষাক্ত প্রবৃত্তি অঙ্কুরেই বিনাশ করতে হবে। এটি কোনো সাধারণ উপদেশ নয়, এটি হলো আত্মরক্ষার পরম মন্ত্র। আসুরিকতা থেকে বাঁচার জন্য এই তিন শত্রুকে চেনা এবং তাদের থেকে দূরে থাকাই হলো জীবনের প্রথম পাঠ।
তাত্ত্বিক গভীরতা: কাম, ক্রোধ ও লোভ হলো মনের ক্যান্সার। এই তিনটির উপস্থিতি মানেই হলো আসুরিকতার প্রবেশপথ উন্মুক্ত হওয়া। এগুলো ত্যাগ করাই হলো প্রকৃত তপস্যা এবং সুস্থ জীবনের ভিত্তি।