॥ অধ্যায় ১৮, শ্লোক ১১ ॥

ন হি দেহভৃতা শক্যং ত্যক্তুং কর্মাণ্যশেষতঃ ।
যস্তু কর্মফলত্যাগী স ত্যাগীত্যভিধীয়তে ॥ ১১ ॥

সরল ভাবার্থ

দেহধারী কোনো মানুষের পক্ষেই সমস্ত কর্ম অশেষভাবে (সম্পূর্ণরূপে) পরিত্যাগ করা সম্ভব নয়। অতএব, যিনি কর্মের ফল পরিত্যাগ করেন, তিনিই প্রকৃত ত্যাগী হিসেবে অভিহিত হন।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এখানে একটি অত্যন্ত বাস্তব সত্য তুলে ধরেছেন। মানুষ যতক্ষণ এই রক্ত-মাংসের শরীরে আবদ্ধ থাকে, ততক্ষণ তার পক্ষে সম্পূর্ণ নিস্ক্রিয় হওয়া অসম্ভব। বেঁচে থাকার জন্য শ্বাস গ্রহণ, অন্ন গ্রহণ, এমনকি চিন্তনও এক একটি কর্ম। সুতরাং যারা মনে করেন যে তাঁরা কাজ ছেড়ে দিয়ে অলস বসে থাকলেই 'ত্যাগী' হয়ে যাবেন, তাঁরা ভ্রান্তিতে আছেন। দেহ থাকা মানেই প্রকৃতির গুণের প্রভাবে কর্মের সাথে যুক্ত থাকা।

তা হলে মুক্তির পথ কী? শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, কর্মকে নয় বরং 'কর্মফল'কে ত্যাগ করতে হবে। কর্মফল ত্যাগ মানে হলো কাজের ফলাফলের প্রতি আসক্তি বা দুশ্চিন্তা না রাখা। যখন একজন মানুষ তার সব কাজ ঈশ্বর অর্পণ বুদ্ধিতে বা জগতের কল্যাণে করে এবং লাভের আশায় বসে থাকে না, তখনই তাকে বলা হয় 'কর্মফলত্যাগী'। এই মানসিক ত্যাগই হলো প্রকৃত ত্যাগ।

এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে আধ্যাত্মিকতা মানে কর্ম থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং কর্মের ধরন পাল্টে ফেলা। একজন মা যেমন সন্তানের সেবা করেন কোনো ফলের আশা ছাড়াই, একজন প্রকৃত সাধককেও তেমনি পৃথিবীর প্রতিটি কাজ করতে হবে নিঃস্বার্থভাবে। কাজের বন্ধন তখনই কাটে যখন তাতে 'অহংকার' থাকে না। আপনি আপনার চাকরী, ব্যবসা বা পড়াশোনা ছেড়ে দিলেই ত্যাগী হবেন না; বরং সেই কাজগুলো করার সময় যখন ভাববেন আমি কেবল ভগবানের একজন যন্ত্র, তখনই আপনি প্রকৃত ত্যাগের আনন্দ অনুভব করবেন। দেহের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নিয়ে মনের মুক্তি খোঁজাই হলো গীতার সারকথা।
তাত্ত্বিক গভীরতা: শরীরের ধর্মই হলো কর্ম। কিন্তু মনের ধর্ম হলো সমর্পণ। কর্মফল ত্যাগের মাধ্যমেই মানুষ কর্মের জালে আটকা না পড়েও এই সংসারে বিচরণ করতে পারে।