সরল ভাবার্থ
যারা কর্মফল ত্যাগ করেন না (অত্যাগী), মৃত্যুর পর তাদের কর্মের তিন প্রকার ফল ভোগ করতে হয়—অনিষ্ট (নরক বা পশুযোনি), ইষ্ট (স্বর্গ বা উচ্চতর জন্ম) এবং মিশ্র (মানুষ রূপ জন্ম)। কিন্তু সন্ন্যাসীদের অর্থাৎ যারা ফল ত্যাগ করেছেন, তাদের কখনও কোনো ফল ভোগ করতে হয় না।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
মানুষের কর্মের ফলাফল কীভাবে তাকে পরবর্তী জন্মেও তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়, শ্রীকৃষ্ণ তা এখানে বর্ণনা করেছেন। যারা আসক্ত হয়ে কাজ করে, তাদের ফল ভোগ করার জন্য বারবার পৃথিবীতে ফিরে আসতে হয়। 'অনিষ্ট' ফল হলো পাপ কাজের পরিণাম, যা মানুষকে নীচ যোনিতে নিয়ে যায়। 'ইষ্ট' ফল হলো ভালো কাজের পুণ্যফল, যা সাময়িকভাবে স্বর্গের সুখ দেয়। আর 'মিশ্র' ফল হলো ভালো-মন্দের সংমিশ্রণ, যার ফলে মানুষ হিসেবে এই দুঃখ-সুখের পৃথিবীতে জন্ম হয়।
কিন্তু 'সন্ন্যাসী' বা যারা কর্মফল ত্যাগ করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম খাটে না। কেন? কারণ তারা কাজের সাথে নিজেদের অহংকারকে যুক্ত করেন না। তারা জানেন যে তাঁরা কেবল যন্ত্র। যখন কোনো কাজের সাথে 'আমি' ভাব থাকে না, তখন সেই কাজের কোনো প্রতিক্রিয়া বা কর্মফল সঞ্চিত হয় না। একেই বলা হয় 'বিমুক্ত' দশা।
এই শ্লোকটি আমাদের জীবনের একটি গভীর সত্য উপলব্ধি করায়। আমরা সারাদিন যা কিছু করি, তার একটি ছাপ আমাদের অবচেতন মনে থেকে যায়। এই সংস্কারই আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করে। যদি আমরা আসক্তি থেকে মুক্তি না পাই, তবে এই জন্ম-মৃত্যুর চক্র চলতেই থাকবে। শ্রীকৃষ্ণ আমাদের উপদেশ দিচ্ছেন যেন আমরা সন্ন্যাসীর মতো মনোভাব নিয়ে চলি। সন্ন্যাসী মানে লৌকিক সন্ন্যাস নয়, বরং মানসিক সন্ন্যাস—যেখানে আমরা ফলের পরোয়া না করে কেবল কর্ম করি। এর ফলে আমরা কর্মের সুদূরপ্রসারী জাল থেকে মুক্তি পাই এবং পরম শান্তি লাভ করি। মুক্তি মানে কর্মহীনতা নয়, বরং কর্মফলের দায়ভার থেকে মুক্তি।
তাত্ত্বিক গভীরতা: আসক্তিই কর্মের বীজকে অঙ্কুরিত করে। আসক্তিহীনতা সেই বীজকে ভাজা বীজের মতো করে দেয়, যা আর কোনো কর্মফলের জন্ম দিতে পারে না। এটিই হলো মোক্ষলাভের পরম রহস্য।