সরল ভাবার্থ
কর্মের পাঁচটি কারণ হলো—১. অধিষ্ঠান (শরীর), ২. কর্তা (অহংকার বা জীবাত্মা), ৩. করণ (ইন্দ্রিয়সমূহ), ৪. বিবিধ চেষ্টা (প্রচেষ্টা বা শক্তি) এবং ৫. দৈব (পরমাত্মা বা ভাগ্য)।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
এই শ্লোকটি কর্মবিজ্ঞানের চূড়ান্ত বিশ্লেষণ। ১. অধিষ্ঠান: শরীর হলো কর্মের ক্ষেত্র বা আধার। শরীর ছাড়া কাজ করা অসম্ভব। ২. কর্তা: যে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয় অর্থাৎ আমাদের বুদ্ধি বা অহংকার। ৩. করণ: চোখ, কান, হাত বা মনের মতো ইন্দ্রিয়গুলো যার মাধ্যমে কাজ করা হয়। ৪. চেষ্টা: কাজের জন্য প্রয়োজনীয় দৈহিক ও মানসিক শক্তি বা শ্রম। ৫. দৈব: এটিই সবচাইতে রহস্যময় ও গুরুত্বপূর্ণ কারণ—অর্থাৎ প্রকৃতির বিধান বা পরমেশ্বরের ইচ্ছা।
ভাবুন তো, আমাদের কাছে শরীর আছে, কাজ করার ইচ্ছাও আছে, ইন্দ্রিয়গুলোও সচল এবং আমরা প্রচুর পরিশ্রমও করছি; কিন্তু তবুও অনেক সময় কাজ সফল হয় না। কেন? কারণ সেই পঞ্চম কারণ অর্থাৎ 'দৈব' অনুকূল থাকে না। শ্রীকৃষ্ণ এখানে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, আমরা যখন কোনো কাজ করি তখন আমরা এই পাঁচটি কারণের মাত্র একটি অংশ (কর্তা)। বাকি চারটি জিনিস আমাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই।
এই জ্ঞান আমাদের অহংকার দূর করে। যখনই আমরা ভাবি সব আমার জন্য হয়েছে, তখনই আমরা মিথ্যা বলছি। কারণ 'দৈব' বা ঈশ্বরের কৃপা ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না। এই সত্য উপলব্ধি করলে মানুষ যেকোনো পরিস্থিতিতে শান্ত থাকতে পারে। সাফল্য এলে সে মাতোয়ারা হয় না কারণ সে জানে এতে আরও অনেকের হাত আছে। আবার ব্যর্থ হলেও সে বিষণ্ণ হয় না কারণ সে বোঝে দৈব হয়তো অন্য কিছু চাইছে। এটিই হলো প্রকৃত আধ্যাত্মিক সাম্য।
তাত্ত্বিক গভীরতা: কর্ম হলো একটি যৌথ প্রক্রিয়া। মানুষ তার প্রচেষ্টাটুকু করতে পারে, কিন্তু ফল দেওয়ার চাবিকাঠি সেই পরম কারণ বা 'দৈব'-এর হাতে। এই বোধই কর্মযোগীকে আসক্তিহীন করে।