সরল ভাবার্থ
মানুষ শরীর, বাক্য বা মনের দ্বারা যে কর্মই শুরু করুক না কেন—তা ন্যায্য (শাস্ত্রীয়) হোক অথবা বিপরীত (অশাস্ত্রীয়)—তার পেছনে ঐ পাঁচটি কারণই বিদ্যমান থাকে।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
শ্রীকৃষ্ণ এখানে কর্মের পরিধি বুঝিয়ে দিচ্ছেন। মানুষ কেবল হাতের কাজের দ্বারাই কর্ম করে না; কথা বলা (বাক্য) এবং চিন্তা করাও (মন) এক একটি কর্ম। আমরা অনেক সময় ভাবি যে আমি তো কোনো খারাপ কাজ করিনি, কিন্তু আমাদের মনে যদি কারও প্রতি হিংসা থাকে, তবে সেটিও একটি 'বিপরীত' বা অশুভ কর্ম। একইভাবে ভালো চিন্তা করাও একটি 'ন্যায্য' কর্ম।
সে কাজ ভালো হোক বা মন্দ, সফল হোক বা বিফল—সব ক্ষেত্রেই ঐ পাঁচটি কারণ (শরীর, কর্তা, ইন্দ্রিয়, চেষ্টা ও দৈব) দায়ী। ভগবান এখানে একটি নিগূঢ় সত্য বলছেন—এমনকি পাপ কাজ করার পেছনের শক্তিটিও পরমেশ্বরের (দৈব) কাছ থেকেই আসে। কিন্তু কাজের 'ইচ্ছা' বা 'কর্তৃত্ব' যেহেতু মানুষের, তাই তার পাপের ভাগী মানুষকেই হতে হয়। যেমন বিদ্যুতের সাহায্যে আলোও জ্বলে আবার মানুষ শক্ও খায়; এখানে বিদ্যুতের কোনো দোষ নেই, দোষ ব্যবহারের।
এই শ্লোকটি আমাদের প্রতিটি কাজের প্রতি সচেতন হতে শেখায়। আমরা যখন বুঝতে পারি যে প্রতিটি চিন্তা এবং প্রতিটি কথার পেছনে ব্রহ্মের শক্তি কাজ করছে, তখন আমরা আমাদের কথা ও মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে বাধ্য হই। এটি আমাদের দায়িত্বশীল হতে শেখায়। একই সাথে এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, যেহেতু সব কাজের পেছনে পাঁচটি কারণ থাকে, তাই ব্যক্তিগত আস্ফালন বা দেমাক করা হাস্যকর। শুভ কাজ করার সময় যেন আমরা বিনয়ী থাকি এবং অশুভ কাজ থেকে যেন দূরে থাকি—এটিই শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা। জীবনের প্রতিটি স্পন্দনই যে এক বিশাল মহাজাগতিক প্রক্রিয়ার অংশ, এই বোধই আমাদের শুদ্ধ করে তোলে।
তাত্ত্বিক গভীরতা: চিন্তা, বাক্য ও ক্রিয়া—এই তিন স্তরেই কর্ম সংঘটিত হয়। প্রতিটি কর্মের বিচারক সেই পরমাত্মা। কর্মের ব্যাপকতা বুঝতে পারলে মানুষের জীবন পবিত্র আরাধনায় পরিণত হয়।