॥ অধ্যায় ১৮, শ্লোক ১৬ ॥

তত্রৈবং সতি কর্তারমাত্মানং কেবলং তু যঃ ।
পশ্যত্যকৃতবুদ্ধিত্বান্ন স পশ্যতি দুর্মতিঃ ॥ ১৬ ॥

সরল ভাবার্থ

কর্মের পাঁচটি কারণ থাকা সত্ত্বেও যিনি অবিশুদ্ধ বুদ্ধির কারণে নিজেকেই একমাত্র কর্তা হিসেবে মনে করেন, সেই দুর্মতি ব্যক্তি প্রকৃত সত্য দেখতে পান না।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

পূর্ববর্তী শ্লোকগুলোতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ব্যাখ্যা করেছিলেন যে কোনো কর্ম সফল হওয়ার পেছনে পাঁচটি কারণ থাকে (শরীর, কর্তা, ইন্দ্রিয়, চেষ্টা ও দৈব)। এই শ্লোকে তিনি সেই সব মানুষের সমালোচনা করেছেন যারা চরম অহংকারে মগ্ন। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, যখন কোনো কাজের পেছনে পাঁচটি কারণ সম্মিলিতভাবে কাজ করছে, তখন যে মানুষ ভাবে— আমিই সব করেছি, আমার শক্তিতেই এটি হয়েছে—সে আসলে একজন 'দুর্মতি' বা ভ্রান্ত বুদ্ধির মানুষ।

কেন মানুষ এমন ভুল করে? ভগবান বলছেন 'অকৃতবুদ্ধিত্বাৎ'—অর্থাৎ যার বুদ্ধি এখনো শাস্ত্র বা গুরুর উপদেশে শুদ্ধ হয়নি। আমরা যখন দেখি কোনো যন্ত্র কাজ করছে, তখন আমরা কেবল বাইরের অংশটি দেখি, ভেতরের বিদ্যুৎ বা মেকানিজমটি দেখি না। তেমনি অজ্ঞ মানুষ তার শরীরের বাইরের কর্ম দেখে নিজেকেই সর্বেসর্বা মনে করে। তারা ভুলে যায় যে তাদের নিশ্বাস নেওয়ার শক্তি, চিন্তা করার সামর্থ্য এমনকি পরিবেশের অনুকূলতা—সবই সেই 'দৈব' বা পরমাত্মার কৃপা।

এই শ্লোকটি আমাদের অতি-অহংকার থেকে বাঁচায়। আমরা যখন কোনো বড় সাফল্য অর্জন করি, তখন আমরা ক্রেডিট নেওয়ার জন্য পাগল হয়ে যাই। কিন্তু এই শ্লোকটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা কেবল একটি ক্ষুদ্র কারণ মাত্র। এটি আমাদের বিনয় শিক্ষা দেয়। প্রকৃত জ্ঞান হলো এটি বোঝা যে আমি সেই মহান বিশ্ব-প্রক্রিয়ার একটি সামান্য অংশ মাত্র। যে ব্যক্তি নিজেকেই সব কাজের একমাত্র কারণ ভাবে, সে আসলে সত্য থেকে দূরে সরে যায় এবং এই মিথ্যা অহংকারই তার পতনের কারণ হয়। সত্য দর্শন করতে হলে অহংকারের পর্দা সরাতে হবে।
তাত্ত্বিক গভীরতা: অহংকার হলো আধ্যাত্মিক অন্ধত্ব। নিজেকে কর্তা মনে করা মানেই হলো কর্মফলের জালে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা। যিনি নিজেকে যন্ত্র মনে করেন, তিনিই প্রকৃত মুক্ত পুরুষ।