সরল ভাবার্থ
যাঁঁর মধ্যে আমি কর্তা এই রূপ অহংকার নেই এবং যাঁর বুদ্ধি কর্মে লিপ্ত হয় না, তিনি এই সমস্ত প্রাণীকে হত্যা করলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি হত্যা করেন না এবং সেই কর্মের ফলে আবদ্ধ হন না।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
এটি গীতার একটি অত্যন্ত বৈপ্লবিক এবং উচ্চস্তরের শ্লোক। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এখানে অর্জুনকে সেই মানসিক স্তরে নিয়ে যেতে চাইছেন যেখানে কোনো কর্মই আর বন্ধন সৃষ্টি করতে পারে না। তিনি বলছেন, যদি কারও হৃদয় থেকে 'অহং' বা আমি করছি এই ভাবটি পুরোপুরি মুছে যায়, তবে তার কাজগুলো আর তার নিজস্ব কাজ থাকে না; সেগুলো ব্রহ্মের কাজে পরিণত হয়।
এই শ্লোকটির অপব্যাখ্যা হতে পারে, কিন্তু এর প্রকৃত তাৎপর্য হলো আসক্তিহীনতা। একজন বিচারক যখন দণ্ডাদেশ দেন, তখন তিনি কাউকে ব্যক্তিগত শত্রুতা থেকে মারেন না, তিনি আইনের রক্ষক হিসেবে কাজ করেন। তেমনি যে সাধকের বুদ্ধি পরমাত্মায় স্থির, তিনি জগতকে রক্ষা করার জন্য যদি কোনো কঠিন কাজও করেন (যেমন যুদ্ধে শত্রু নিধন), তবে সেই পাপ তাঁকে স্পর্শ করে না। কারণ তাঁর মনে কোনো হিংসা বা স্বার্থ নেই। তিনি কেবল ঈশ্বরের হাতের একটি যন্ত্র মাত্র।
বুদ্ধি 'না লিপ্যতে' মানে হলো কাজের ফলাফল ভালো হোক বা খারাপ—তার প্রভাব মনের গভীরে পড়ে না। আমরা যখন বুঝতে পারি যে এই দেহ, মন এবং জগত সবই প্রকৃতির নিয়মে চলছে এবং আমি কেবল সাক্ষী, তখনই আমরা এই মহিমান্বিত স্তরে পৌঁছাতে পারি। এটি কোনো সাধারণ মানুষের জন্য নয়, এটি হলো একজন স্থিতপ্রজ্ঞ মহাপুরুষের অবস্থা। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, ক্ষত্রিয় হিসেবে ধর্মযুদ্ধ করা তাঁর কর্তব্য; তিনি যদি অহংকার ছেড়ে এই যুদ্ধ করেন, তবে কোনো পাপই তাঁকে স্পর্শ করবে না। এটি কর্মের বন্ধন থেকে চিরস্থায়ী মুক্তির পথ।
তাত্ত্বিক গভীরতা: কর্তৃত্ববোধের অভাবই হলো সবচাইতে বড় সন্ন্যাস। যখন ভক্তের 'আমি' ভগবানের 'ইচ্ছা'র সাথে মিশে যায়, তখন তার প্রতিটি কাজই উপাসনায় পরিণত হয়।