॥ অধ্যায় ১৮, শ্লোক ১৮ ॥

জ্ঞানং জ্ঞেয়ং পরিজ্ঞাতা ত্রিবিধা কর্মচোদনা ।
করণং কর্ম কর্তেতি ত্রিবিধঃ কর্মসংগ্রহঃ ॥ ১৮ ॥

সরল ভাবার্থ

জ্ঞান, জ্ঞেয় (জানার বিষয়) এবং পরিজ্ঞাতা (যিনি জানেন)—এই তিনটি হলো কর্মের প্রেরণা। আবার করণ (উপকরণ), কর্ম এবং কর্তা—এই তিনটি হলো কর্মের আশ্রয় বা সংগ্রহ।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এখানে একটি কর্ম শুরু হওয়া থেকে শেষ হওয়া পর্যন্ত পুরো মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়াটি বিশ্লেষণ করেছেন। কোনো কাজ শুরু করার আগে আমাদের ভেতরে এক প্রকার 'প্রেরণা' বা 'চোদনা' তৈরি হয়। এর তিনটি স্তর আছে: ১. পরিজ্ঞাতা: যে ব্যক্তি জানে। ২. জ্ঞান: জানার ক্ষমতা বা উপায়। ৩. জ্ঞেয়: যা জানতে হবে। এই তিনটি যখন একত্রিত হয়, তখনই মানুষের মনে কর্ম করার ইচ্ছা জাগে।

ইচ্ছা জাগার পর সেই কর্মটি যখন বাস্তবে রূপ পায়, তখন তাকে বলা হয় 'কর্মসংগ্রহ'। এরও তিনটি উপাদান আছে: ১. কর্তা: যে কাজ করে। ২. করণ: কাজ করার হাতিয়ার বা ইন্দ্রিয়সমূহ। ৩. কর্ম: স্বয়ং সেই কাজটি। শ্রীকৃষ্ণ বোঝাতে চাইছেন যে, কর্মের এই সূক্ষ্ম জালটি অত্যন্ত জটিল। আমরা কেবল বাইরের 'কর্তা'কে দেখি, কিন্তু তার পেছনে যে জ্ঞান ও প্রেরণা কাজ করছে, তা আমাদের নজরে আসে না।

এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, আমাদের প্রতিটি কাজের মূলে রয়েছে আমাদের 'জ্ঞান'। আমাদের জ্ঞানের স্তর যেমন হবে, আমাদের কর্মের ধরনও তেমন হবে। যদি আমাদের জ্ঞান অশুদ্ধ হয়, তবে প্রেরণা ভুল হবে এবং ফলাফলও অশুভ হবে। তাই জীবন পরিবর্তন করতে হলে প্রথমে নিজের জ্ঞানের শুদ্ধি প্রয়োজন। এটি একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষা যা আমাদের নিজেদের ইচ্ছা ও আচরণের মূল উৎস খুঁজে পেতে সাহায্য করে। কর্মকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে তার পেছনে থাকা এই ছয়টি উপাদানকে বুঝতে হবে।
তাত্ত্বিক গভীরতা: কর্ম কেবল হাত-পা নাড়ানো নয়; এটি একটি মানসিক ও বৌদ্ধিক প্রক্রিয়া। প্রেরণা ও আশ্রয়ের এই বিজ্ঞান বুঝতে পারলে মানুষ নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রক হতে পারে।