॥ অধ্যায় ১৮, শ্লোক ২ ॥

শ্রীভগবানুবাচ ।
কাম্যানাং কর্মণাং ন্যাসং সন্ন্যাসং কবয়ো বিদুঃ ।
সর্বকর্মফলত্যাগং প্রাহুস্ত্যাগং বিচক্ষণাঃ ॥ ২ ॥

সরল ভাবার্থ

শ্রীভগবান বললেন—পণ্ডিতগণ কাম্য কর্মসমূহের (সকাম কর্ম) ত্যাগকে 'সন্ন্যাস' বলেন এবং অভিজ্ঞ জ্ঞানীগণ সমস্ত কর্মের ফল ত্যাগকে 'ত্যাগ' বলেন।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এখানে সন্ন্যাস ও ত্যাগের এক বৈপ্লবিক সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। সাধারণ দৃষ্টিতে সন্ন্যাস মানে কর্ম ছেড়ে দেওয়া, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ বলছেন 'কাম্যানাং কর্মণাং ন্যাসং'। অর্থাৎ যে কর্মগুলো কেবল নিজের জাগতিক বাসনা বা ইন্দ্রিয় তৃপ্তির জন্য করা হয় (যেমন স্বর্গে যাওয়ার জন্য পুণ্যকর্ম বা ধনলাভের জন্য বিশেষ অনুষ্ঠান), সেই সব কামনা-ভিত্তিক কর্ম বর্জন করাই হলো প্রকৃত সন্ন্যাস। সন্ন্যাসী কর্ম ত্যাগ করেন না, তিনি কেবল 'স্বার্থ' ত্যাগ করেন।

অন্যদিকে 'ত্যাগ' বলতে ভগবান বুঝিয়েছেন 'সর্বকর্মফলত্যাগ'। এটি আরও ব্যাপক। একজন সংসারী মানুষ বা একজন ছাত্র বা একজন সেবক যখন তার প্রতিদিনের সব কাজ অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে করে, কিন্তু সেই কাজের ফলাফল ভগবানের চরণে অর্পণ করে, তখনই তা প্রকৃত ত্যাগ হয়। বিচক্ষণ ব্যক্তিদের মতে, কর্মফল ত্যাগের মাধ্যমেই মন পবিত্র হয়।

এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, ঘর-বাড়ি ছেড়ে বনে গেলেই কেউ সন্ন্যাসী হয় না; যদি তার মনে ফলের আশা থাকে তবে সে আসলে সন্ন্যাসী নয়। আবার ঘরে থেকেও যদি কেউ তার কাজকে ফলের আশা ছাড়া সেবায় পরিণত করে, তবে সে-ই শ্রেষ্ঠ ত্যাগী। সন্ন্যাস হলো কর্মের নির্বাচন (সকাম কর্ম বাদ দেওয়া), আর ত্যাগ হলো কর্মের মানসিকতা (ফলের মায়া ত্যাগ করা)। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি বুঝতে পারলে মানুষের জীবন থেকে দুশ্চিন্তা দূর হয় এবং প্রতিটি কর্মই একটি ধ্যানে পরিণত হয়। আধ্যাত্মিক পথের পথিকদের জন্য এটি একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা।
তাত্ত্বিক গভীরতা: কাম্য কর্মের ত্যাগ মানে আসক্তির জড় থেকে মুক্তি। আর কর্মফল ত্যাগ মানে ঈশ্বরীয় ইচ্ছায় নিজেকে সমর্পণ করা। এই দুইয়ের সমন্বয়েই মানুষের মোক্ষ লাভ হয়।