সরল ভাবার্থ
কোনো কোনো মনীষী (সাংখ্যবাদীগণ) বলেন যে, কর্ম দোষযুক্ত বলে তা বর্জন করা উচিত; আবার অন্যান্যরা বলেন যে, যজ্ঞ, দান ও তপস্যা রূপ কর্ম কখনও বর্জন করা উচিত নয়।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
ধর্মীয় জগতের একটি চিরন্তন বিতর্কের দিকে শ্রীকৃষ্ণ এখানে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। অনেক দার্শনিক বা মুনি মনে করেন যে, যেকোনো কর্মই বন্ধনের কারণ। কর্ম করলেই তাতে কিছু না কিছু হিংসা বা দোষ থাকে (যেমন চাষ করতে গেলে কিছু কীট-পতঙ্গ মারা যায় বা জীবন ধারণে অন্য প্রাণীর ক্ষতি হয়)। এই 'দোষ' থেকে বাঁচতে তারা সমস্ত কর্ম ছেড়ে দিয়ে নিস্ক্রিয়তাকে শ্রেয় মনে করেন।
আবার অন্য এক দল জ্ঞানী (যেমন মীমাংসকগণ) মনে করেন যে, কর্ম ছাড়া জীবন ও জগৎ অচল। তাঁরা বিশেষত যজ্ঞ, দান এবং তপস্যা—এই তিনটি মহান কর্মকে কখনও না ছাড়ার পক্ষপাতী। তাঁদের মতে, এই কাজগুলো মানুষকে শুদ্ধ করে।
এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, সত্যের অনেকগুলো দিক থাকতে পারে এবং শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতদের মধ্যেও মতভেদ থাকে। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে এই সব পরস্পরবিরোধী যুক্তির মধ্যে না হারিয়ে পরম সত্য কী, তা জানতে উদ্বুদ্ধ করছেন। আমরা যদি মনে করি কাজ করলেই পাপ হবে তবে আমরা ভয়ে জড় হয়ে থাকব। আবার যদি কেবল লৌকিকতা রক্ষায় কাজ করি, তবে মনের মুক্তি হবে না। ভগবান এখানে আলোচনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করছেন যেন আমরা বুঝতে পারি কোনো পরিস্থিতিতে কোন কর্মটি বর্জনীয় এবং কোনটি অপরিহার্য। এটি ত্যাগের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ যা কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয়, বরং জীবনের বাস্তব সমস্যার সমাধান দেয়।
তাত্ত্বিক গভীরতা: কর্ম নিজে দোষী নয়, দোষ হলো কর্মীর আসক্তিতে। যজ্ঞ, দান ও তপস্যা হলো সেই সব কর্ম যা মানুষের চেতনার স্তরকে উচ্চতর থেকে উচ্চতর অবস্থায় নিয়ে যায়।