॥ অধ্যায় ১৮, শ্লোক ৪ ॥

নিশ্চয়ং শৃণু মে তত্র ত্যাগে ভরতসত্তম ।
ত্যাগো হি পুরুষব্যাঘ্র ত্রিবিধঃ সংপ্রকীর্তিতঃ ॥ ৪ ॥

সরল ভাবার্থ

হে ভরতসত্তম! হে পুরুষব্যাঘ্র! ত্যাগের বিষয়ে আমার সুনিশ্চিত সিদ্ধান্ত শ্রবণ কর। ত্যাগকে সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তামসিক—এই তিন প্রকারে বিভক্ত করা হয়েছে।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

পণ্ডিতদের মধ্যে নানা মতভেদ শোনার পর অর্জুন যখন বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন, তখন পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং ত্যাগের চূড়ান্ত বিচার ঘোষণা করছেন। এখানে 'নিশ্চয়ং শৃণু মে' কথাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ এটি স্বয়ং পরমাত্মার সিদ্ধান্ত। তিনি অর্জুনকে 'ভরতসত্তম' (ভরত বংশের শ্রেষ্ঠ) এবং 'পুরুষব্যাঘ্র' (মানুষের মধ্যে সিংহের ন্যায় বীর) সম্বোধন করে তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ করছেন।

শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে, ত্যাগ কোনো একরৈখিক বিষয় নয়। মানুষের প্রকৃতির গুণ অনুযায়ী ত্যাগ তিন প্রকারের হয়—সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তামসিক। আমরা অনেক সময় ঘর ছাড়ি আলস্যের কারণে (তামসিক) বা নিজের কষ্টের ভয়ে (রাজসিক); এগুলো প্রকৃত ত্যাগ নয়। প্রকৃত ত্যাগ হলো সাত্ত্বিক ত্যাগ, যা মানুষ তাঁর কর্তব্যবোধ থেকে করে।

এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, কোনো কাজ বা আচরণ বিচার করার আগে তার পেছনের মানসিকতা বা 'গুণ' বিচার করা জরুরি। কেবল বাহ্যিক ত্যাগ দেখেই কাউকে মহান বলা যায় না। ভগবান এখানে আমাদের জীবনকে এক উচ্চতর মানদণ্ডে বিচার করতে শেখাচ্ছেন। ত্যাগের এই শ্রেণিবিভাগ আমাদের আত্মবিশ্লেষণ করতে সাহায্য করে যে, আমরা কোন উদ্দেশ্য নিয়ে কিছু ত্যাগ করছি। এটিই মোক্ষযোগের ভিত্তি, কারণ ভুল ত্যাগের মাধ্যমে কোনোদিন মুক্তি সম্ভব নয়। প্রকৃত ত্যাগের বিজ্ঞান বুঝতে হলে এই গুণের প্রভাবগুলো জানা অপরিহার্য।
তাত্ত্বিক গভীরতা: ভগবানের সিদ্ধান্তই হলো চূড়ান্ত সত্য। ত্যাগ কেবল ক্রিয়া নয়, এটি চেতনার একটি গুণ। সঠিক গুণের মাধ্যমে করা ত্যাগই মানুষের আত্মার উন্নতির সোপান।