॥ অধ্যায় ১৮, শ্লোক ২১ ॥

পৃথক্ত্বেন তু যজ্জ্ঞানং নানাভাবান্ পৃথক্বিধান্ ।
বেত্তি সর্বেষু ভূতেষু তজ্জ্ঞানং বিদ্ধি রাজসম্ ॥ ২১ ॥

সরল ভাবার্থ

যে জ্ঞানের দ্বারা মানুষ বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যে পৃথক পৃথক সত্তা বা ভিন্ন ভিন্ন ভাব প্রত্যক্ষ করে, তাকে 'রাজসিক জ্ঞান' বলা হয়।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

রাজসিক জ্ঞান হলো পার্থক্যের জ্ঞান। সাত্ত্বিক জ্ঞান যেখানে সবাইকে এক করে দেখে, রাজসিক জ্ঞান সেখানে বিভেদ তৈরি করে। এই স্তরের মানুষ মনে করে যে প্রতিটি শরীরের আত্মা আলাদা এবং তাদের যোগ্যতা, ধর্ম বা জাতি অনুযায়ী তারা একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। এখানে মানুষ কেবল শরীরের ওপর ভিত্তি করে জগতকে বিচার করে। তারা মনে করে, আমি আলাদা, তুমি আলাদা; আমার পরিবার শ্রেষ্ঠ, তোমারটা হীন। এই 'পৃথক-ভাব' থেকেই সমাজে দলাদলি, হিংসা এবং অসমতার সৃষ্টি হয়।

রাজসিক ব্যক্তি জগতকে তার নিজের স্বার্থের চশমা দিয়ে দেখে। সে মনে করে জীবনের মূল উদ্দেশ্য হলো অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়া এবং নিজের আধিপত্য বিস্তার করা। এই জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তি সব সময় 'আমার' এবং 'তোমার'—এই দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকে। তারা আধ্যাত্মিক একত্ব বুঝতে পারে না, ফলে তাদের মনে কখনও স্থায়ী শান্তি আসে না। এই জ্ঞান মানুষকে বস্তুবাদী করে তোলে এবং তাকে কর্মের মায়াজালে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ফেলে।

বর্তমান যুগে আমাদের তথাকথিত আধুনিক শিক্ষার বড় একটি অংশ এই রাজসিক জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে, যা মানুষকে প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে নামিয়ে দেয়। শ্রীকৃষ্ণ সতর্ক করছেন যে, যতক্ষণ আমরা একে অপরকে আলাদা ভাবব, ততক্ষণ আমরা পরমাত্মার পরম শান্তি লাভ করতে পারব না। মুক্তি পেতে হলে এই বিভেদের প্রাচীর ভাঙতে হবে।
তাত্ত্বিক গভীরতা: পার্থক্য বা দ্বৈতবোধই দুঃখের কারণ। রাজসিক জ্ঞান সত্যকে খণ্ড খণ্ড করে দেখে, তাই এটি পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান নয়। এটি মানুষকে মোহের সাগরে নিমজ্জিত রাখে।