॥ অধ্যায় ১৮, শ্লোক ৩১ ॥

যয়া ধর্মমধর্মং চ কার্যং চাকার্যমেব চ ।
অযথা বৎপ্রজানাতি বুদ্ধিঃ সা পার্থ রাজসী ॥ ৩১ ॥

সরল ভাবার্থ

হে পার্থ! যে বুদ্ধির দ্বারা ধর্ম ও অধর্ম এবং কর্তব্য ও অকর্তব্য কর্মের যথার্থ রূপ নির্ণয় করা যায় না (অর্থাৎ অস্পষ্ট থাকে), সেই বুদ্ধিই হলো 'রাজসী বুদ্ধি'।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

রাজসিক বুদ্ধি হলো বিভ্রান্তির প্রথম ধাপ। সাত্ত্বিক বুদ্ধি যেখানে আয়নার মতো পরিষ্কার, রাজসিক বুদ্ধি সেখানে ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। রাজসিক স্তরের মানুষ সাধারণত খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয় এবং নিজের স্বার্থের চশমা দিয়ে জগতকে বিচার করে। যখনই আমরা নিজের লাভের জন্য কোনো কাজকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করি, তখনই বুঝতে হবে আমাদের রাজসিক বুদ্ধি কাজ করছে।

এই বুদ্ধির প্রধান সমস্যা হলো 'অযথাবৎ' জ্ঞান। অর্থাৎ, সে ধর্মকে পুরোপুরি অস্বীকার করে না, কিন্তু তাকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করে। সে মনে করে, একটু মিথ্যে বললে যদি অনেক টাকা আসে, তবে তাতে দোষ নেই। সে কর্তব্য ও অকর্তব্যের সীমারেখা গুলিয়ে ফেলে। রাজসিক বুদ্ধি মানুষকে সর্বদা অস্থির রাখে কারণ সে সর্বদা ফলের প্রত্যাশা করে। তার কাছে ধর্ম কেবল তখনই মূল্যবান, যখন তা তাকে সামাজিক প্রতিপত্তি বা জাগতিক সুখ দিতে পারে।

বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক সময়ে অনেক শিক্ষার্থী বা পেশাদার এই রাজসিক বুদ্ধির ফাঁদে পড়েন। তাঁরা সফল হওয়ার জন্য নীতি-নৈতিকতাকে শিথিল করে দেন। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে সতর্ক করছেন যে, এই বুদ্ধি দিয়ে সাময়িক জয় পাওয়া গেলেও আত্মার শান্তি লাভ করা সম্ভব নয়। রাজসিক বুদ্ধি মানুষকে মোহের গভীরে নিয়ে যায় এবং তাকে সারাক্ষণ উদ্বেগের মধ্যে রাখে। প্রকৃত সত্য জানতে হলে আমাদের নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বিচার করতে শিখতে হবে। যখন বিচারশক্তি আবেগের দ্বারা প্রভাবিত হয়, তখনই তা রাজসিকতায় পরিণত হয়।
তাত্ত্বিক গভীরতা: স্বার্থপরতা বুদ্ধিকে অন্ধ করে দেয়। রাজসিক বুদ্ধি কেবল তাৎক্ষণিক লাভ দেখে, কিন্তু কর্মের সুদূরপ্রসারী ফল বুঝতে পারে না। এটি মানুষকে সংশয়ের দিকে ঠেলে দেয়।