সরল ভাবার্থ
এই পৃথিবীতে অথবা স্বর্গে দেবতাদের মধ্যেও এমন কোনো প্রাণী বা অস্তিত্ব নেই, যা প্রকৃতির এই তিনটি গুণ (সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ) থেকে মুক্ত।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
এটি গীতার একটি অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক এবং সারগর্ভ শ্লোক। শ্রীকৃষ্ণ এখানে ঘোষণা করছেন যে সমগ্র সৃষ্টি—পৃথিবী থেকে স্বর্গ পর্যন্ত—প্রকৃতির এই তিনটি গুণের জালে আবদ্ধ। কোনো মানুষই এর বাইরে নয়, এমনকি দেবতাদের মধ্যেও এই গুণের প্রভাব বিদ্যমান। প্রকৃতি মানেই হলো এই তিন গুণের খেলা। আমরা যা কিছু দেখি, শুনি বা চিন্তা করি, সবই এই ত্রিগুণের কোনো না কোনো সংমিশ্রণ।
এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, আমরা যতক্ষণ এই জড় জগতে আছি, আমাদের ওপর এই গুণের প্রভাব থাকবেই। তবে এর অর্থ এই নয় যে আমরা অসহায়। এই বিশ্লেষণের মূল উদ্দেশ্য হলো আমাদের সচেতন করা। যখন আমরা জানতে পারি যে আমাদের রাগ রাজসিকতা থেকে আসছে বা আমাদের আলস্য তামসিকতা থেকে আসছে, তখন আমরা ধীরে ধীরে সাত্ত্বিকতার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারি।
চরম লক্ষ্য হলো 'গুণাতীত' হওয়া। অর্থাৎ এই তিন গুণের ঊর্ধ্বে উঠে পরমাত্মার সাথে যুক্ত হওয়া। যে এই গুণের প্রভাব বুঝতে পারে, সে আর পরিস্থিতির ওপর দোষ দেয় না; সে নিজের ভেতরের গুণগুলোকে সংশোধন করে। এই বিশ্ব-প্রক্রিয়া একটি বিশাল যন্ত্রের মতো যা ত্রিগুণ দ্বারা পরিচালিত। কেবল ঈশ্বরভক্তি এবং আত্মজ্ঞানের মাধ্যমেই এই মায়াময় গুণের জাল ছিন্ন করে মুক্ত হওয়া সম্ভব। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে এবং আমাদের সবাইকে এই মহাজাগতিক সত্যের মুখোমুখি করালেন।
তাত্ত্বিক গভীরতা: সৃষ্টির প্রতিটি অণু-পরমাণু ত্রিগুণাত্মক। এই সত্য অনুধাবন করাই হলো প্রকৃত বিজ্ঞান। গুণকে চিনে গুণাতীত হওয়ার সাধনাই হলো শ্রেষ্ঠ সাধনা।