সরল ভাবার্থ
হে পরন্তপ অর্জুন! ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্রদের কর্মসমূহ তাঁদের স্বভাবজাত গুণ অনুসারে বিভক্ত করা হয়েছে।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এখানে সমাজ ও ব্যক্তির কর্মবিভাগের একটি গভীর আধ্যাত্মিক ভিত্তি প্রদান করেছেন। আমরা প্রায়ই মনে করি বর্ণপ্রথা জন্মগত, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ এখানে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে এটি 'স্বভাবপ্রভবৈর্গুণৈঃ'—অর্থাৎ ব্যক্তির নিজস্ব স্বভাব ও গুণের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। প্রকৃতির তিনটি গুণ (সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ) প্রতিটি মানুষের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন অনুপাতে থাকে। এই গুণের সংমিশ্রণেই আমাদের রুচি, দক্ষতা এবং প্রবণতা তৈরি হয়।
শাস্ত্রমতে, যার মধ্যে সত্ত্বগুণ প্রধান তিনি ব্রাহ্মণোচিত কর্মে আগ্রহী হন। যার মধ্যে রজঃগুণ প্রবল এবং সত্ত্ব গৌণ, তিনি ক্ষত্রিয়ের ন্যায় বীরত্বপূর্ণ কাজে পারদর্শী হন। রজঃ ও তমোর সংমিশ্রণে বৈশ্যের বৃত্তি এবং তমো গুণের প্রাবল্যে শূদ্রের সেবাধর্মী বৃত্তি তৈরি হয়। এটি কোনো বৈষম্য নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল সমাজ ব্যবস্থার বিজ্ঞান। যেমন একটি দেহের হাত, পা, মুখ ও মাথার কাজ আলাদা কিন্তু প্রতিটি অঙ্গই দেহের জন্য অপরিহার্য, সমাজও তেমনি এই চার ধরণের কর্মীর সমন্বয়ে পূর্ণতা পায়।
এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, আমাদের প্রত্যেকের ভেতরেই একটি বিশেষ সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। আমরা যদি আমাদের স্বভাবজাত গুণের বিরুদ্ধে গিয়ে কাজ করি, তবে আমরা জীবনে শান্তি পাই না। ধর্ম মানে কেবল পূজা-পাঠ নয়, বরং নিজের স্বভাব অনুযায়ী জগতের সেবা করা। ঈশ্বর চান আমরা যেন আমাদের শ্রেষ্ঠ গুণটি দিয়ে তাঁর সৃষ্টিকে সমৃদ্ধ করি। এই কর্মবিভাগ আসলে আধ্যাত্মিক উন্নতির একটি সোপান, যেখানে প্রতিটি মানুষ তাঁর নিজের জায়গায় থেকে ঈশ্বরকে লাভ করতে পারেন।
তাত্ত্বিক গভীরতা: স্বভাবই মানুষের ধর্ম নির্ধারণ করে। যখন কর্ম গুণের সাথে মিলে যায়, তখন সেই কর্ম আর বোঝা থাকে না, তা সাধনায় পরিণত হয়। প্রতিটি বর্ণই ব্রহ্মের এক একটি রূপ।