॥ অধ্যায় ১৮, শ্লোক ৪৬ ॥

যতঃ প্রবৃত্তির্ভূতানাং যেন সর্বমিদং ততম্ ।
স্বকর্মণা ত্যমভ্যর্চ্য সিদ্ধিং বিন্দতি মানবঃ ॥ ৪৬ ॥

সরল ভাবার্থ

যাঁ হতে সমস্ত প্রাণীর উৎপত্তি এবং যাঁর দ্বারা এই সমগ্র জগৎ পরিব্যাপ্ত, মানুষ নিজের স্বাভাবিক কর্মের দ্বারা সেই পরমেশ্বরের পূজা করে পরম সিদ্ধি লাভ করতে পারে।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এটি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অন্যতম শক্তিশালী শ্লোক। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এখানে পূজা বা উপাসনার এক নতুন ও বৈপ্লবিক সংজ্ঞা দিয়েছেন। সাধারণ অর্থে আমরা পূজা বলতে মন্দির, ধূপ-দীপ বা মন্ত্রোচ্চারণকে বুঝি। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, প্রকৃত পূজা হলো নিজের ওপর অর্পিত কাজ বা 'স্বধর্ম' যথাযথভাবে পালন করা।

এই জগতের প্রতিটি কণা পরমাত্মার দ্বারা ব্যাপ্ত। তিনি আমাদের ভেতরের শক্তি হিসেবে বিদ্যমান এবং তাঁর ইচ্ছাতেই সৃষ্টির চাকা ঘুরছে। যেহেতু প্রতিটি কর্ম সেই পরমশক্তিরই অংশ, তাই আমরা যখন আমাদের পেশা বা সামাজিক দায়িত্বগুলো পালন করি, তখন তা সরাসরি ঈশ্বরের সেবাতেই অর্পিত হয়। শর্ত শুধু একটিই—কাজটি করতে হবে 'অভ্যর্চ্য' অর্থাৎ পূজা বা অর্পণ বুদ্ধিতে।

একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী যখন নিষ্ঠার সাথে রাস্তা পরিষ্কার করেন, বা একজন চিকিৎসক যখন সেবা দেন—তা যদি ঈশ্বরের তুষ্টির জন্য করা হয়, তবে তা কোনো মন্দিরের আরতির চেয়ে কম নয়। কাজ ছোট হোক বা বড়, তা যখন অহংকারমুক্ত হয়ে জগৎ-পিতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়, তখন সেই কাজই কর্মীর চিত্ত শুদ্ধ করে এবং তাকে সিদ্ধির (Self-realization) দিকে নিয়ে যায়। ভগবানকে পেতে হলে জগত ছেড়ে পালাতে হয় না, বরং জগতের কাজের মধ্যেই জগত-স্বামীকে অনুভব করতে হয়। কর্মই তখন প্রার্থনায় রূপান্তরিত হয়।
তাত্ত্বিক গভীরতা: ঈশ্বর সর্বব্যাপী। তাই পৃথকভাবে তাঁকে খোঁজার চেয়ে নিজের কর্মকে তাঁর চরণে ফুল হিসেবে নিবেদন করাই হলো শ্রেষ্ঠ যোগ। এই শ্লোক কর্মকে আধ্যাত্মিক মর্যাদায় উন্নীত করে।