॥ অধ্যায় ১৮, শ্লোক ৪৭ ॥

শ্রেয়ান্ স্বধর্মো বিগুণঃ পরধর্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ ।
স্বভাবনিয়তং কর্ম কুর্বন্নাপ্নোতি কিল্বিষম্ ॥ ৪৭ ॥

সরল ভাবার্থ

উত্তমরূপে অনুষ্ঠিত পরধর্মের চেয়ে দোষযুক্ত হলেও স্বধর্মই শ্রেয়। মানুষ স্বভাবত নির্দিষ্ট স্বধর্ম পালন করলে কোনো পাপ ভোগ করে না।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এটি একটি অত্যন্ত গভীর জীবন-দর্শনের শ্লোক। 'স্বধর্ম' মানে হলো আমাদের স্বভাবজাত গুণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, অন্য কারো কাজ দেখে অনেক সময় আমাদের মনে হতে পারে যে—ওই কাজটি খুব চমৎকার, আমি কেন ওটা করছি না? কিন্তু অপরের কাজ অনুকরণ করা আত্মিক উন্নতির পথে বাধা।

হয়তো কোনো কাজ করতে গিয়ে অনেক ভুলভ্রান্তি বা ত্রুটি (বিগুণঃ) হচ্ছে, তবুও তা যদি নিজের স্বভাবের অনুগামী হয়, তবে তা-ই করা উচিত। পরধর্ম বা অন্যের কাজ বাইরে থেকে চাকচিক্যময় মনে হলেও তা নিজের আত্মার প্রসাদ আনে না। প্রতিটি মানুষ তাঁর নির্দিষ্ট প্রারব্ধ এবং গুণ নিয়ে জন্মায়। সেই গুণের সাথে বিদ্রোহ করে যখন আমরা অন্য কারো মতো হতে চাই, তখন সমাজে বিশৃঙ্খলা এবং মনের ভেতর হীনম্মন্যতা তৈরি হয়।

ভগবান আশ্বাস দিচ্ছেন যে, নিজের স্বভাব অনুযায়ী কর্ম করলে কোনো 'কিল্বিষম্' বা পাপ স্পর্শ করে না। যেমন হিংসা সাধারণভাবে পাপ, কিন্তু একজন বিচারক যখন অপরাধীকে দণ্ড দেন বা একজন সৈনিক যখন দেশ রক্ষায় অস্ত্র ধরেন, তা তাঁর জন্য পাপ নয় বরং ধর্ম। কারণ তা তাঁর স্বভাব ও কর্তব্যের অংশ। এই শ্লোকটি আমাদের নিজের প্রতি সত্যনিষ্ঠ হতে শেখায়। অন্যের ছায়ায় না থেকে নিজের স্বকীয়তায় উজ্জ্বল হওয়াই হলো আধ্যাত্মিক স্বনির্ভরতা। আমাদের সবার পথ আলাদা, কিন্তু গন্তব্য এক।
তাত্ত্বিক গভীরতা: নকল হওয়ার চেয়ে ত্রুটিপূর্ণ আসল হওয়া ভালো। নিজের স্বভাবের সাথে যুদ্ধ করে কখনও শান্তি পাওয়া যায় না। স্বধর্ম পালনই চিত্তশুদ্ধির একমাত্র পথ।