॥ অধ্যায় ১৮, শ্লোক ৪৮ ॥

সহজং কর্ম কৌন্তেয় সদোষমপি ন ত্যজেৎ ।
সর্বারম্ভা হি দোষেণ ধূমেনাগ্নিরিবাবৃতাঃ ॥ ৪৮ ॥

সরল ভাবার্থ

হে কৌন্তেয়! দোষ থাকলেও স্বভাবজাত কর্ম ত্যাগ করা উচিত নয়; কারণ ধোঁয়া যেমন আগুনকে আবৃত করে রাখে, তেমনি সমস্ত কর্মই কোনো না কোনো দোষ দ্বারা আবৃত।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

মানুষ অনেক সময় নিজের কর্মের নেতিবাচক দিকগুলো দেখে হতোদ্যম হয়ে কাজ ছেড়ে দেয়। ভগবান এখানে একটি চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন—আগুন যখন জ্বলে, তখন ধোঁয়াও বের হয়। আগুনের ধোঁয়া থাকা মানেই কিন্তু এই নয় যে আগুনটা খারাপ। ঠিক তেমনি, এই জগতের কোনো কাজই নিখুঁত বা সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত নয়। প্রতিটি কর্মের সাথেই কিছু না কিছু অপ্রিয় দিক জড়িয়ে থাকে।

একজন কৃষক যখন চাষ করেন, অজান্তেই অনেক পোকামাকড় মারা যায়। একজন ব্যবসায়ী যখন বাণিজ্য করেন, হয়তো কারো কারো ক্ষতি হয়ে যায়। কিন্তু এই সামান্য দোষের জন্য যদি কৃষক চাষ করা বন্ধ করে দেন বা যোদ্ধা যুদ্ধ করা ছেড়ে দেন, তবে জগতের চাকা থেমে যাবে। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, 'সহজং কর্ম' বা যেটা তোমার স্বাভাবিক দায়বদ্ধতা, তা ত্যাগ করো না।

এই শ্লোকটি আমাদের শিখিয়ে দেয় যে পারফেকশন বা নিখুঁত অবস্থার খোঁজে কর্ম থেকে পলায়ন করা বোকামি। আমাদের মনোযোগ থাকা উচিত কর্মের উদ্দেশ্যের ওপর, তার ছোটখাটো দোষের ওপর নয়। আমরা যখন কাজ করি, আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত আগুনের মতো আলো ও উত্তাপ দেওয়া, আর ধোঁয়ার মতো দোষগুলোকে মেনে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। ত্যাগ বলতে কর্ম ত্যাগ নয়, বরং কর্মের আসক্তি ত্যাগই হলো আসল কথা। দোষ তো প্রকৃতির ধর্ম, কিন্তু কর্ম করা হলো আত্মার বিকাশ।
তাত্ত্বিক গভীরতা: মায়িক জগতে কোনো কাজই নির্দোষ নয়। কিন্তু নিষ্কামভাবে কর্ম করলে সেই দোষ কর্মীকে স্পর্শ করে না। কর্মের দোষ দেখা নয়, কর্মের অন্তরালে থাকা ঈশ্বরকে দেখা প্রয়োজন।