সরল ভাবার্থ
ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত প্রসন্নচিত্ত ব্যক্তি কোনো কিছুর জন্য শোক করেন না এবং কোনো কিছুর আকাঙ্ক্ষাও করেন না। তিনি সমস্ত প্রাণীর প্রতি সমদর্শী হন এবং আমার প্রতি পরা ভক্তি লাভ করেন।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
এটি এক অপূর্ব আধ্যাত্মিক অবস্থার বর্ণনা। যখন মানুষ ব্রহ্মের সাথে একাত্ম হয়, তখন তাঁর হৃদয়ে এক অনাবিল আনন্দ বা 'প্রসন্নতা' স্থায়ীভাবে বাস করে। জাগতিক শোক (যা হারিয়ে গেছে তার জন্য দুঃখ) এবং আকাঙ্ক্ষা (যা পাইনি তার জন্য তৃষ্ণা)—এই দুটির কোনোটিই তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। তিনি বোঝেন যে সবকিছুই মায়া এবং একমাত্র ব্রহ্মই সত্য।
এই স্তরে পৌঁছালে মানুষের দৃষ্টি বদলে যায়। তিনি আর কাউকে শত্রু বা মিত্র দেখেন না। তিনি 'সমঃ সর্বেষু ভূতেষু'—অর্থাৎ ক্ষুদ্র পিপীলিকা থেকে শুরু করে মহান দেবতা পর্যন্ত সবার মধ্যেই সেই একই পরমাত্মার দর্শন পান। এই সমদর্শিতা কোনো বুদ্ধির ব্যায়াম নয়, এটি হলো তাঁর স্বভাব। তাঁর কাছে সোনা ও পাথর সমান হয়ে যায়।
সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, এই ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত হওয়ার পরেই মানুষ আমার 'পরা ভক্তি' বা শ্রেষ্ঠ ভক্তি লাভ করে। অনেকে মনে করেন জ্ঞান এবং ভক্তি আলাদা পথ, কিন্তু এই শ্লোক অনুযায়ী জ্ঞানই ভক্তির ভিত্তি। যখন কেউ ভগবানের স্বরূপ জানতে পারে, তখনই তাঁর প্রতি অকৃত্রিম এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসা বা পরা ভক্তি জন্মে। এটি ভক্তির সেই চূড়া যেখানে ভক্ত ও ভগবান এক হয়ে যান। এখানে ভক্তি কোনো স্বার্থের জন্য নয়, বরং প্রেমের তাগিদে। এই অবস্থায় ভক্ত সর্বদা ভগবানের সান্নিধ্য অনুভব করেন।
তাত্ত্বিক গভীরতা: প্রকৃত জ্ঞান মানুষকে শান্ত ও সমদর্শী করে। শোক ও আকাঙ্ক্ষামুক্ত হৃদয়েই পরম ভক্তির উদয় হয়। এটিই হলো মোক্ষ ও প্রেমের চরম মিলনস্থল।