॥ অধ্যায় ১৮, শ্লোক ৫৫ ॥

ভক্ত্যা মামভিজানাতি যাবান্ যশ্চাস্মি তত্ত্বতঃ ।
ততো মাং তত্ত্বতো জ্ঞাত্বা বিশতে তদনন্তরম্ ॥ ৫৫ ॥

সরল ভাবার্থ

ভক্তির মাধ্যমেই মানুষ জানতে পারে আমি কে এবং আমার স্বরূপ তত্ত্বত কী রূপ। এইভাবে আমাকে তত্ত্বত জানার পর তিনি অনতিবিলম্বে আমাতে প্রবেশ করেন।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এটি গীতার চূড়ান্ত উপদেশের সারমর্ম। আমরা ভগবানকে অনেকভাবে ডাকি—কেউ স্রষ্টা হিসেবে, কেউ বিচারক হিসেবে, কেউবা দয়ালু পিতা হিসেবে। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, 'তত্ত্বতঃ' বা প্রকৃতপক্ষে তিনি কে, তা কেবল ভক্তির চশমা দিয়েই দেখা সম্ভব। জ্ঞান আমাদের বুঝতে শেখায় ঈশ্বর আছেন, কিন্তু ভক্তি আমাদের অনুভব করায় তিনি কেমন।

'যাবান্ যশ্চাস্মি'—অর্থাৎ আমার বিস্তার কতখানি এবং আমি আসলে কী, এই রহস্য ভক্তির আলোয় প্রকাশিত হয়। যখন একজন ভক্ত সমস্ত অহংকার বিসর্জন দিয়ে কেবল প্রেমের মাধ্যমে ঈশ্বরের শরণাপন্ন হন, তখন ঈশ্বর স্বয়ং নিজের স্বরূপ ভক্তের হৃদয়ে উন্মোচন করেন। এটি কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক তথ্য নয়, এটি হলো এক আধ্যাত্মিক সাক্ষাৎকার।

শ্লোকের শেষ অংশে বলা হয়েছে 'বিশতে তদনন্তরম্'—অর্থাৎ জানার পর তিনি 'আমাতে প্রবেশ করেন'। প্রবেশ করা মানে হলো লীন হয়ে যাওয়া। যেমন একটি বৃষ্টির ফোঁটা মহাসমুদ্রে পড়লে সমুদ্রই হয়ে যায়, তেমনি ভক্ত তাঁর সীমাবদ্ধ 'আমি' সত্তা হারিয়ে ভগবানের অনন্ত সত্তার সাথে এক হয়ে যান। একেই বলে সাযুজ্য মুক্তি। এখানে জানার পর আর কোনো ব্যবধান থাকে না। এই মিলনই হলো আধ্যাত্মিক যাত্রার শেষ গন্তব্য। এখানে ভক্ত আর ভক্ত থাকেন না, ভগবান আর ভগবান থাকেন না—থাকে কেবল এক অখণ্ড পরম চৈতন্য।
তাত্ত্বিক গভীরতা: ভক্তি হলো সেই চাবিকাঠি যা দিয়ে পরমাত্মার রহস্যময় দুয়ার খোলা যায়। ঈশ্বরকে জানার অর্থ হলো ঈশ্বর হয়ে যাওয়া। এটিই উপনিষদের 'সোহহং' তত্ত্বের বাস্তব রূপ।