সরল ভাবার্থ
হে পার্থ! আসক্তি এবং কর্মফল ত্যাগ করে এই যজ্ঞ, দান ও তপস্যা রূপ কর্মসমূহ সম্পাদন করা উচিত—এটিই আমার সুনিশ্চিত শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্ত।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
পূর্ববর্তী শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন যে যজ্ঞ, দান ও তপস্যা বর্জন করা উচিত নয়। এই শ্লোকে তিনি সেই কর্মগুলো করার 'পদ্ধতি' শিখিয়েছেন। এটিই গীতার 'নিষ্কাম কর্মযোগ'-এর নির্যাস। ভগবান বলছেন, কর্ম ত্যাগ করার চেয়ে কর্মের প্রতি 'সঙ্গ' (আসক্তি) এবং 'ফল' ত্যাগ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। 'সঙ্গং ত্যক্ত্বা' মানে হলো আমি কর্তা এই অহংকার ত্যাগ করা। মানুষ যখন ভাবে—আমি এই মহৎ কাজ করছি, তখন সূক্ষ্মভাবে তার মনে অহংকার জন্মায় যা বন্ধনের কারণ হয়।
এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, কর্ম নিজে বন্ধন নয়, কর্মের পেছনে আমাদের যে মালিকানাবোধ, সেটিই বন্ধন। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে এবং আমাদের সবাইকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, কর্মকে 'কর্তব্য' (duty) হিসেবে করতে হবে, 'প্রত্যাশা' হিসেবে নয়। যখন আমরা কোনো ফল না চেয়ে কেবল ঈশ্বরের সন্তুষ্টির জন্য বা জগতের কল্যাণে কাজ করি, তখন সেই কাজ আমাদের পবিত্র করে।
ভগবান এখানে 'নিশ্চিতং মতমুত্তমম্' কথাটি ব্যবহার করেছেন, যার অর্থ হলো এটি কোনো সাধারণ পরামর্শ নয়, এটিই ব্রহ্মজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্ত। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে—তা চাকরি হোক, পড়াশোনা হোক বা সামাজিক সেবা—যদি এই আসক্তিহীন ভাবটি রাখা যায়, তবে মানুষ কর্মের জালে জড়িয়ে পড়ে না। এটিই হলো কর্মে থেকেও অকর্মের আনন্দ। ত্যাগের প্রকৃত অর্থ হলো মনের ভেতর থেকে ফলের আকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দেওয়া, বাহ্যিকভাবে কর্ম বন্ধ করা নয়। এটিই মানুষকে মুক্তির দ্বারে পৌঁছে দেয়।
তাত্ত্বিক গভীরতা: আসক্তিহীন কর্মই আধ্যাত্মিক স্বাধীনতার চাবিকাঠি। কাজকে পূজা হিসেবে গ্রহণ করলে ফলের চিন্তা মনকে বিক্ষিপ্ত করতে পারে না। এটিই জীবনের শ্রেষ্ঠ জীবনদর্শন।