॥ অধ্যায় ১৮, শ্লোক ৭ ॥

নিয়তস্য তু সন্ন্যাসঃ কর্মণো নোপপদ্যতে ।
মোহাত্তস্য পরিত্যাগস্তামসঃ পরিকীর্তিতঃ ॥ ৭ ॥

সরল ভাবার্থ

নিয়ত (শাস্ত্রবিহিত বা প্রাত্যহিক) কর্ম পরিত্যাগ করা উচিত নয়। মোহবশত সেই কর্ম পরিত্যাগ করাকে 'তামসিক ত্যাগ' বলা হয়।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এখানে ত্যাগের নেতিবাচক দিকটি অর্থাৎ 'তামসিক ত্যাগ' নিয়ে আলোচনা করেছেন। আমাদের জীবনের কিছু কর্তব্য আছে যা 'নিয়ত' বা অবশ্য পালনীয় (যেমন মা-বাবার সেবা, সন্তান পালন বা নিজের সৎ পেশার দায়িত্ব)। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, এই দায়িত্বগুলো বর্জন করা আধ্যাত্মিকতা নয়। অনেক মানুষ অলসতা, ভয় বা অজ্ঞতার কারণে নিজের দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যায় এবং ভাবে সে 'সন্ন্যাস' নিয়েছে। আসলে এটি হলো 'মোহ' বা ভ্রান্তি।

তামসিক ত্যাগের মূলে থাকে মোহ এবং জড়তা। তামসিক ব্যক্তি মনে করে কর্ম করা মানেই কষ্ট, তাই সে কর্ম থেকে দূরে থাকে। একে অনেক সময় 'ছদ্ম-সন্ন্যাস'ও বলা হয়। যারা নিজের ঘর-সংসারের দায়িত্ব পালন না করে কেবল ফাঁকি দেওয়ার জন্য বা আলস্যের বশবর্তী হয়ে ত্যাগের দোহাই দেয়, শ্রীকৃষ্ণ তাদের ত্যাগকে 'তামসিক' বলেছেন।

এই শ্লোকটি আমাদের সতর্ক করে যে, কর্মের প্রতি ঘৃণা বা অনীহা থেকে যে ত্যাগ জন্মায়, তা মানুষকে মুক্তির বদলে অন্ধকারে নিয়ে যায়। প্রকৃত সন্ন্যাস মানে দায়িত্ব পালনের শক্তি অর্জন করা, দায়িত্ব এড়িয়ে চলা নয়। অর্জুন যুদ্ধের ময়দানে তাঁর ক্ষত্রিয় ধর্ম বা দায়িত্ব পালন করতে চাইছিলেন না; শ্রীকৃষ্ণ বুঝিয়ে দিলেন যে তাঁর এই পালানোর চেষ্টা আসলে তামসিকতার লক্ষণ। সত্যকার ধর্ম মানুষকে সাহসী ও দায়িত্বশীল করে তোলে। ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে সত্য পথ বিচ্যুত হওয়া আত্মার পতন ডেকে আনে। ত্যাগের নামে ফাঁকিবাজি কোনোদিন ঈশ্বরীয় হতে পারে না।
তাত্ত্বিক গভীরতা: আলস্য আর সন্ন্যাস এক নয়। মোহগ্রস্ত মন যখন কর্মকে ভয় পায়, তখন সে ত্যাগের অজুহাত খোঁজে। এটিই অজ্ঞানতার পরম সীমা।