॥ অধ্যায় ১৮, শ্লোক ৬২ ॥

তমেব শরণং গচ্ছ সর্বভাবেন ভারত ।
তৎপ্রসাদাৎপরাং শান্তিং স্থানং প্রাপ্স্যসি শাশ্বতম্ ॥ ৬২ ॥

সরল ভাবার্থ

হে ভারত! তুমি সর্বতোভাবে সেই ঈশ্বরের শরণাপন্ন হও। তাঁর কৃপায় তুমি পরম শান্তি এবং শাশ্বত পরম ধাম লাভ করবে।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এই শ্লোকটি হলো ভক্তি এবং আশ্রয়ের এক চূড়ান্ত আশ্বাস। শ্রীকৃষ্ণ আগের শ্লোকে বলেছিলেন ঈশ্বর হৃদয়ে বসে যন্ত্রের মতো আমাদের চালাচ্ছেন। এখন তিনি বলছেন সেই নিয়ন্ত্রণকারীর কাছে নিজেকে সমর্পণ করার কথা। 'সর্বভাবেন' শব্দটির অর্থ অত্যন্ত গভীর—এর অর্থ হলো আপনার চিন্তা, কর্ম, আবেগ এবং অস্তিত্বের প্রতিটি কণা দিয়ে ঈশ্বরের ওপর নির্ভর করা। যখন আমরা বলি হে ঈশ্বর, আমি আপনার, তখন আমাদের জীবনের সমস্ত বোঝা হালকা হয়ে যায়।

মানুষ যখন নিজে সব সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখনই সে বুঝতে পারে যে তাঁর শক্তির চেয়েও বড় এক শক্তি এই ব্রহ্মাণ্ড পরিচালনা করছে। এই শ্লোকে ভগবান প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, শরণাগতির ফলে আসবে 'পরাং শান্তিং' বা পরম শান্তি। এটি কেবল দুশ্চিন্তাহীন অবস্থা নয়, এটি হলো আত্মার সেই প্রশান্তি যা বাইরের কোনো আঘাতেও নষ্ট হয় না।

পরিশেষে তিনি 'শাশ্বত স্থান' বা বৈকুণ্ঠ লাভের কথা বলেছেন। এই নশ্বর জগতে সবকিছু পরিবর্তনশীল এবং দুঃখজনক। কিন্তু ঈশ্বরের চরণে আশ্রয় নিলে মানুষ সেই অবিনাশী রাজ্যে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পায়, যেখানে নেই কোনো জন্ম-মৃত্যুর চক্র। এটিই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, অহংকার ত্যাগ করে ঈশ্বরের কাছে সাহায্য চাওয়াই হলো সবচাইতে বড় বীরত্ব। কারণ তাঁর কৃপা (প্রসাদ) ছাড়া পরম শান্তি লাভ অসম্ভব।
তাত্ত্বিক গভীরতা: শরণাগতি মানে নিষ্ক্রিয় হওয়া নয়, বরং নিজের কর্মকে ভগবানের অর্পণ করা। তাঁর প্রসাদই মানুষকে মুক্তি ও চিরস্থায়ী শান্তি প্রদান করে।