॥ অধ্যায় ১৮, শ্লোক ৬৩ ॥

ইতি তে জ্ঞানমাখ্যাতং গুহ্যাগ্নুহ্যতরং ময়া ।
বিমৃশ্যৈতদশেষেণ যথেষ্টথা কুরু ॥ ৬৩ ॥

সরল ভাবার্থ

এইভাবে গোপন হতেও অতি গোপনীয় জ্ঞান আমি তোমাকে বললাম। তুমি এটি সবিস্তারে বিচার করো এবং তারপর তোমার যা ইচ্ছা তাই করো।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এটি হলো গীতার সবচাইতে গণতান্ত্রিক এবং মানবিক শ্লোক। পুরো গীতা জুড়ে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে উপদেশ দিয়েছেন, নিজের বিশ্বরূপ দেখিয়েছেন এবং মোক্ষলাভের পথ বাতলে দিয়েছেন। কিন্তু এখন শেষে এসে তিনি বলছেন—'যথেষ্টথা কুরু' অর্থাৎ তোমার যা ইচ্ছা তাই করো। ভগবান এখানে মানুষের 'মুক্ত ইচ্ছা' বা Free Will-কে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছেন।

ধর্ম কোনো জবরদস্তির বিষয় নয়। ভগবান চান না যে আমরা না বুঝে কোনো অন্ধ অনুকরণ করি। তিনি আমাদের বুদ্ধি দিয়েছেন যাতে আমরা তাঁর জ্ঞানকে 'অশেষেণ' বা সম্পূর্ণভাবে বিচার (বিমৃশ্য) করতে পারি। গীতায় কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ এবং ভক্তিযোগের যে কথা বলা হয়েছে, তা আমাদের জীবনের প্রেক্ষাপটে যাচাই করার স্বাধীনতা আমাদের আছে।

এই শ্লোকটি প্রমাণ করে যে শ্রীকৃষ্ণ একজন ডিক্টেটর নন, বরং তিনি একজন শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। একজন শিক্ষক যেমন ছাত্রকে সব বুঝিয়ে দেওয়ার পর পরীক্ষার খাতায় লেখার দায়িত্ব ছাত্রের ওপর ছেড়ে দেন, ভগবানও তেমনি জীবনের দর্শন বুঝিয়ে দেওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার আমাদের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। এটি এক বিশাল দায়িত্বও বটে। কারণ সঠিক বা ভুল—যাই আমরা বেছে নিই না কেন, তার ফল আমাদেরই ভোগ করতে হবে। এই শ্লোকটি আমাদের নিজের জীবনের দায়িত্ব নিতে শেখায়। সত্য প্রকাশিত হয়েছে, এখন তাকে গ্রহণ করা বা বর্জন করা আমাদের অভিরুচি।
তাত্ত্বিক গভীরতা: জ্ঞান লাভের পর বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করাই হলো প্রকৃত ধর্ম। ঈশ্বর মানুষের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেন না। তিনি কেবল পথ দেখান, চলতে হয় মানুষকে নিজেই।