॥ অধ্যায় ১৮, শ্লোক ৭২ ॥

কচ্চিদেতচ্ছ্রুতং পার্থ ত্বয়ৈকাগ্রেণ চেতসা ।
কচ্চিদজ্ঞানসম্মোহঃ প্রনষ্টস্তে ধনঞ্জয় ॥ ৭২ ॥

সরল ভাবার্থ

হে পার্থ! তুমি কি একাগ্রচিত্তে এই সব কিছু শ্রবণ করেছ? হে ধনঞ্জয়! তোমার অজ্ঞানজনিত মোহ কি এখন সম্পূর্ণভাবে বিনাশপ্রাপ্ত হয়েছে?

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

পুরো গীতা শোনানোর পর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এখন একজন আদর্শ শিক্ষকের মতো অর্জুনের কাছে 'ফিডব্যাক' চাইছেন। এই শ্লোকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি মনোযোগের গুরুত্ব তুলে ধরে। 'একাগ্রেণ চেতসা' বা একাগ্রচিত্তে শোনা ছাড়া জ্ঞান লাভ করা সম্ভব নয়। ভগবান জানতে চাইছেন যে, দীর্ঘ আলোচনার পর অর্জুনের মন কি স্থির হয়েছে?

অর্জুন যখন যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়ে অস্ত্র ত্যাগ করেছিলেন, তখন তাঁর মূল সমস্যা ছিল 'অজ্ঞানসম্মোহঃ'—অর্থাৎ মায়া বা ভুল ধারণার কারণে তৈরি হওয়া মোহ। তিনি নিজের কর্তব্য ভুলে গিয়েছিলেন এবং আত্মীয়তার মোহে অন্ধ হয়ে পড়েছিলেন। অজ্ঞানতা হলো সেই অন্ধকার যেখানে মানুষ সত্যকে দেখতে পায় না। শ্রীকৃষ্ণ এখানে সরাসরি প্রশ্ন করছেন—সেই অন্ধকার কি দূর হয়েছে?

এই প্রশ্নটি কেবল অর্জুনের জন্য নয়, আমাদের প্রত্যেকের জীবনের জন্য। আমরা যখন গীতা পড়ি বা ঈশ্বরের কথা শুনি, তখন আমাদের নিজেদেরও প্রশ্ন করা উচিত—আমাদের অজ্ঞানতা কি দূর হচ্ছে? আমরা কি এখনো সেই পুরনো মোহ ও মায়ার জালে আটকে আছি? শ্রীকৃষ্ণ এখানে ধনঞ্জয় (যিনি সম্পদ জয় করেছেন) বলে সম্বোধন করে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, বাহ্যিক জয়ের চেয়ে নিজের ভেতরের মোহকে জয় করাই বড় বিজয়। ঈশ্বরের করুণা আমাদের পাশে আছে, কিন্তু আমাদের পক্ষ থেকেও একাগ্রতা ও সচেতনতা প্রয়োজন। এই জিজ্ঞাসার মাধ্যমেই অর্জুনের উত্তরের পথ প্রশস্ত হয় এবং এক নতুন জীবনের সূচনা হয়।
তাত্ত্বিক গভীরতা: জ্ঞান লাভের প্রথম শর্ত হলো একাগ্রতা। মোহ হলো পরম সত্যের পথে বড় বাধা। গুরুর কাজ হলো শিষ্যকে জাগিয়ে তোলা, আর শিষ্যের কাজ হলো সজাগ থেকে তা গ্রহণ করা।