॥ অধ্যায় ১৮, শ্লোক ৭৩ ॥

অর্জুন উবাচ ।
নষ্টো মোহঃ স্মৃতির্লব্ধা ত্বত্প্ৰসাদন্ময়াচ্যুত ।
স্থিতোঽস্মি গতসন্দেহঃ করিষ্যে বচনং তব ॥ ৭৩ ॥

সরল ভাবার্থ

অর্জুন বললেন—হে অচ্যুত! তোমার প্রসাদে আমার মোহ বিনষ্ট হয়েছে এবং আমি আত্মস্মৃতি ফিরে পেয়েছি। এখন আমি সন্দেহমুক্ত হয়ে স্থির হয়েছি। আমি তোমার নির্দেশ পালন করব।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এটি হলো অর্জুনের মোহভঙ্গের চূড়ান্ত ঘোষণা। পুরো গীতার সাফল্যের মুহূর্ত হলো এই শ্লোকটি। অর্জুন স্বীকার করছেন যে, তাঁর ভেতরের অন্ধকার (নষ্টো মোহঃ) কেটে গেছে। কিন্তু তিনি এটিও বলতে ভোলেননি যে এটি তাঁর নিজের শক্তিতে হয়নি—হয়েছে 'ত্বত্প্রসাদাৎ' বা ভগবানের কৃপায়। আধ্যাত্মিক যাত্রায় নিজের প্রচেষ্টার চেয়ে গুরুর কৃপা বড়।

'স্মৃতির্লব্ধা' কথাটি খুব গভীর। এর মানে হলো অর্জুন তাঁর আসল পরিচয় মনে করতে পেরেছেন। তিনি যে শরীর নন, তিনি যে অবিনাশী আত্মা এবং ভগবানের নিত্য সেবক—এই পরম সত্যটি মায়ার কারণে তিনি ভুলে গিয়েছিলেন। মোহ আসলে এক ধরণের বিস্মৃতি। এখন তিনি আবার পূর্ণ চেতনায় ফিরে এসেছেন।

অর্জুন বলছেন—'গতসন্দেহঃ' বা আমি এখন সন্দেহমুক্ত। সংশয় হলো বিনাশের কারণ, আর নিশ্চয়তা হলো শক্তির আধার। শ্লোকের শেষ বাক্যটি হলো গীতার সবচাইতে বড় শিক্ষা—'করিষ্যে বচনং তব' (আমি তোমার কথা মতোই কাজ করব)। এর মাধ্যমে অর্জুন নিজের জেদ, নিজের তথাকথিত অহিংসা এবং নিজের সমস্ত ব্যক্তিগত চিন্তা ত্যাগ করে ভগবানের ইচ্ছার কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিলেন। এটিই হলো প্রকৃত শরণাগতি। যখন কোনো মানুষ তাঁর ক্ষুদ্র বুদ্ধিকে ভগবানের চরণে ত্যাগ করে তাঁর আদেশে চলতে শুরু করে, তখনই জীবনের সব জটিলতা শেষ হয়ে যায়। অর্জুন এখন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, কারণ এটি আর তাঁর নিজস্ব যুদ্ধ নয়, এটি এখন ধর্মের ও ভগবানের যুদ্ধ।
তাত্ত্বিক গভীরতা: মোহমুক্তি মানেই হলো নিজের স্বরূপ ফিরে পাওয়া। ভগবানের ইচ্ছা পালন করাই হলো জীবের শ্রেষ্ঠ ধর্ম। সংশয়মুক্ত হৃদয়ই ভগবানের কাজের উপযুক্ত ক্ষেত্র।