সরল ভাবার্থ
অর্জুন বললেন—হে জনার্দন! হে কেশব! যদি আপনার মতে কর্ম অপেক্ষা জ্ঞান বা বুদ্ধিই শ্রেষ্ঠ হয়, তবে কেন আমাকে এই ভয়াবহ যুদ্ধে (ঘোর কর্মে) নিযুক্ত করছেন?
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
তৃতীয় অধ্যায়ের শুরুতে অর্জুনের এই প্রশ্নটি অত্যন্ত যৌক্তিক এবং আমাদের সবার মনের কথা। দ্বিতীয় অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ আত্মজ্ঞান এবং স্থিতপ্রজ্ঞের লক্ষণ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছিলেন যে যার বুদ্ধি স্থির, সে-ই প্রকৃত শান্ত। অর্জুন সাধারণ মানুষের মতো মনে করলেন যে, যদি জ্ঞানই শ্রেষ্ঠ হয় তবে কাজ করার দরকার কী? বিশেষ করে যুদ্ধের মতো হিংস্র এবং ভয়াবহ কাজ। তিনি ভাবলেন, তার চেয়ে বরং ধ্যান করা বা নির্জনে জ্ঞানচর্চা করা ভালো।
অর্জুন এখানে কৃষ্ণকে 'জনার্দন' বলে ডেকেছেন। জনার্দন মানে—যিনি জনগণের প্রার্থনা শোনেন এবং তাদের পাপ নাশ করেন। অর্জুন ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, আপনি তো সবার মঙ্গল চান, তবে আমাকে এই পাপে কেন ঠেলছেন? তিনি কৃষ্ণকে 'কেশব' বলেও সম্বোধন করেছেন। কেশব মানে—যিনি কেশী নামক অসুরকে সংহার করেছিলেন। অর্জুন বলতে চাইছেন যে আপনি অসুর মারতে পারেন, কিন্তু আমার মতো ভক্তকে কেন এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে নামাচ্ছেন?
এই শ্লোকটি জীবনের এক চিরন্তন দ্বন্দ্বকে তুলে ধরে—ভক্তি ও জ্ঞান বনাম কর্ম। আমরা প্রায়ই ভাবি যে আধ্যাত্মিক হতে হলে জগত ছেড়ে বা কাজ ছেড়ে দিতে হবে। অর্জুনও তাই মনে করেছিলেন। তিনি জ্ঞানকে কর্মের বিরোধী হিসেবে দেখছিলেন। তিনি ভাবছিলেন জ্ঞান মানে হলো নিষ্ক্রিয়তা বা কাজ থেকে মুক্তি। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ পরের শ্লোকগুলোতে বোঝাবেন যে জ্ঞান ও কর্ম আলাদা কিছু নয়, বরং সঠিক জ্ঞানের সাথে কাজ করাই হলো প্রকৃত যোগ।
ধর্মীয় বিচারে, এটি হলো শিষ্যের জিজ্ঞাসু মনের পরিচয়। অর্জুন সত্য জানতে চান, তিনি বিভ্রান্ত হতে চান না। যখন আমরা জীবনের কঠিনতম পরিস্থিতির মুখোমুখি হই, তখন আমাদের মনেও এমন প্রশ্ন আসে—কেন আমাকে এত খাটতে হচ্ছে? কেন আমি শান্তিতে থাকতে পারছি না? অর্জুনের এই প্রশ্নের মাধ্যমেই কর্মযোগের মতো এক মহান দর্শনের অবতারণা হবে যা আমাদের প্রতিটি কর্মকে ঈশ্বরের উপাসনায় পরিণত করতে শেখায়।