॥ অধ্যায় ৩, শ্লোক ২ ॥

ব্যামিশ্রেণেব বাক্যেন বুদ্ধিং মোহয়সীব মে ।
তদেকং বদ নিশ্চিত্য যেন শ্রেয়োঽহমাপ্নুয়াম্ ॥ ৩.২ ॥

সরল ভাবার্থ

আপনার এই আপাতবিরোধী (দ্ব্যর্থবোধক) বাক্যের দ্বারা আমার বুদ্ধি যেন মোহাচ্ছন্ন হচ্ছে। অতএব, সেই একটি পথের কথা আমাকে নিশ্চিত করে বলুন, যার দ্বারা আমি পরম কল্যাণ (শ্রেয়) লাভ করতে পারি।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের ওপর তাঁর পূর্ণ অধিকার এবং নির্ভরতা নিয়ে বলছেন যে, আপনি কখনও বলছেন জ্ঞান ভালো, আবার বলছেন যুদ্ধ করো। আপনার কথাগুলো আমার কাছে গোলমেলে মনে হচ্ছে ('ব্যামিশ্রেণেব')। অর্জুন খুব স্পষ্টভাবে বলছেন যে তিনি মোহগ্রস্ত হচ্ছেন। একজন শিষ্যের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে সে তার গুরুকে নির্ভয়ে বলতে পারে যে সে বুঝতে পারছে না। অর্জুন এখানে 'শ্রেয়' লাভের পথ জানতে চেয়েছেন।

বেদে বা শাস্ত্রের বিভিন্ন জায়গায় কখনও 'কর্মকাণ্ড' (যজ্ঞ-দান) আবার কখনও 'জ্ঞানকাণ্ড' (আত্মার চিন্তা)-এর কথা বলা হয়েছে। অর্জুন মনে করছেন কৃষ্ণ হয়তো তাঁকে বিভ্রান্ত করছেন। তিনি এখন আর অনেকগুলো বিকল্প চান না; তিনি চান কেবল একটি নিশ্চিত পথ ('তদেকং বদ')। অর্জুন খুব সচেতনভাবে 'সুখ' না চেয়ে 'শ্রেয়' চেয়েছেন। সুখ হলো ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু শ্রেয় হলো আত্মার স্থায়ী কল্যাণ বা মুক্তি।

এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে সত্য জানার জন্য একাগ্রতা প্রয়োজন। আমরা যখন জীবনে অনেক উপদেশ বা বই পড়ি, তখন অনেক সময় বিভ্রান্ত হয়ে যাই। অর্জুনের এই দাবি—আমাকে একটি পথ বলুন—হলো সত্যের সন্ধানে একাগ্রতার বহিঃপ্রকাশ। তিনি বুঝতে পেরেছেন যে জীবন অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে এবং এই রণক্ষেত্রে দীর্ঘ তর্কের সময় নেই।

ধর্মীয় বিচারে, অর্জুন এখানে আমাদের প্রতিনিধিত্ব করছেন। আমরাও অনেক সময় ধর্মকে খুব জটিল মনে করি। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ পরের শ্লোকগুলোতে দেখাবেন যে জীবন আসলে জটিল নয়, আমাদের আসক্তিই জীবনকে জটিল করে। তিনি কর্ম এবং জ্ঞানের মধ্যে যে চমৎকার সেতুবন্ধন তৈরি করবেন, তা-ই হলো গীতার অনন্য দান। অর্জুনের এই ব্যাকুলতা না থাকলে আমরা হয়তো 'কর্মযোগ'-এর মতো এই অমূল্য শিক্ষা পেতাম না।