॥ অধ্যায় ৩, শ্লোক ৩ ॥

শ্রীভগবানুবাচ :
লোকেঽস্মিন দ্বিবিধা নিষ্ঠা পুরা প্রোক্তা ময়ানঘ ।
জ্ঞানযোগেন সাংখ্যানাং কর্মযোগেন যোগিনাম্ ॥ ৩.৩ ॥

সরল ভাবার্থ

শ্রীভগবান বললেন—হে নিষ্পাপ অর্জুন! এই জগতে দুই প্রকার নিষ্ঠার কথা আমি পূর্বে বলেছি। জ্ঞানীদের জন্য 'জ্ঞানযোগ' (সাঙ্খ্যযোগ) এবং কর্মঠ ব্যক্তিদের জন্য 'কর্মযোগ'।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

শ্রীকৃষ্ণ এখানে অর্জুনের বিভ্রান্তি দূর করতে শুরু করেছেন। তিনি অর্জুনকে 'অনঘ' বা নিষ্পাপ বলে সম্বোধন করেছেন। এর মানে হলো, যার হৃদয়ে পাপ নেই, কেবল সেই ভগবানের গূঢ় তত্ত্ব বুঝতে পারে। কৃষ্ণ বলছেন যে তিনি সৃষ্টির শুরুতেই এই দুই পথের কথা বলেছিলেন। প্রথমটি হলো 'সাঙ্খ্য' বা জ্ঞানযোগ—যেখানে মানুষ বুদ্ধির মাধ্যমে বিচার করে বুঝতে পারে যে আত্মা অবিনাশী এবং জগত নশ্বর। যারা অত্যন্ত অন্তর্মুখী এবং চিন্তাশীল, এটি তাদের পথ।

দ্বিতীয় পথটি হলো 'কর্মযোগ'। এটি সেই যোগীদের জন্য যারা জগতের মাঝে থেকে কাজ করতে ভালোবাসেন। শ্রীকৃষ্ণ বোঝাচ্ছেন যে এই দুই পথ আসলে একে অপরের পরিপূরক। জ্ঞান ছাড়া কর্ম অন্ধ, আর কর্ম ছাড়া জ্ঞান পঙ্গু। মানুষ মনে করে জ্ঞান মানে কিছু না করা, কিন্তু কৃষ্ণ বলছেন যে সঠিক জ্ঞান নিয়ে কাজ করাই হলো বড় সাধনা। অর্জুন একজন ক্ষত্রিয়, তাঁর স্বভাব হলো কর্মঠ। তাঁর জন্য কর্মযোগই হলো শ্রেষ্ঠ পথ।

এই শ্লোকটি আমাদের জীবনের একটি বড় বাস্তবতাকে তুলে ধরে—সবার প্রকৃতি এক নয়। কেউ নিরিবিলি বসে পড়াশোনা বা চিন্তা করতে পছন্দ করেন, আবার কেউ মানুষের মাঝে থেকে কাজ করতে ভালোবাসেন। ভগবান বলছেন যে কোনো পথই ছোট নয়। যদি কেউ নিঃস্বার্থভাবে কর্ম করে, তবে সে-ও সেই পরম শান্তিতে পৌঁছাতে পারবে যেখানে একজন জ্ঞানী পৌঁছান।

ধর্মীয় বিচারে, এটি হলো বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। আমাদের হিন্দু ধর্মে কেন এতগুলো পথ (ভক্তি, জ্ঞান, কর্ম, রাজযোগ)? কারণ মানুষের রুচি ভিন্ন। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন যে তুমি যেই পথেই চলো না কেন, নিষ্ঠা থাকতে হবে। নিষ্ঠা মানে হলো একাগ্রতা। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে নিজেকে চেনা এবং নিজের স্বভাব অনুযায়ী পরমেশ্বরের পথে চলাই হলো বুদ্ধিমত্তার কাজ।