॥ অধ্যায় ৩, শ্লোক ১০ ॥

সহযজ্ঞাঃ প্রজাঃ সৃষ্ট্বা পুরোবাচ প্রজাপতিঃ ।
অনেন প্রসিবিষ্যধ্বমেষ বোঽস্ত্বিষ্টকামধুক্ ॥ ৩.১০ ॥

সরল ভাবার্থ

সৃষ্টির আদিতে প্রজাপতি ব্রহ্মা যজ্ঞের সাথে প্রজাদের সৃষ্টি করে বলেছিলেন—এই যজ্ঞের মাধ্যমে তোমরা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি লাভ করো এবং এই যজ্ঞ তোমাদের সমস্ত কাঙ্ক্ষিত ফল দান করুক।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

শ্রীকৃষ্ণ এখানে কর্ম ও যজ্ঞের এক সুপ্রাচীন ইতিহাসের কথা বলছেন। তিনি বলছেন যে সৃষ্টি এবং যজ্ঞ অবিচ্ছেদ্য। ব্রহ্মা যখন মানুষ সৃষ্টি করেছিলেন, তখনই তিনি তাদের হাতে যজ্ঞের বিধান তুলে দিয়েছিলেন। এর অর্থ হলো, মানুষ এবং প্রকৃতি একে অপরের পরিপূরক। আমরা প্রকৃতি থেকে যা নিচ্ছি, তার বিনিময়ে আমাদেরও কিছু ফিরিয়ে দিতে হবে—এটিই হলো যজ্ঞের মূল দর্শন।

যজ্ঞকে এখানে 'ইষ্টকামধুক' বা কামধেনু বলা হয়েছে। কামধেনু যেমন সব ইচ্ছা পূরণ করে, তেমনি যজ্ঞ বা নিঃস্বার্থ কর্মের মাধ্যমে মানুষ যা চায় তাই পেতে পারে। তবে এই চাওয়া কেবল নিজের জন্য নয়, এটি হলো বিশ্বকল্যাণের জন্য। ব্রহ্মা বলেছিলেন যে যজ্ঞের মাধ্যমেই তোমরা 'প্রসবিষ্যধ্বম' অর্থাৎ বংশবিস্তার এবং সমৃদ্ধি লাভ করবে। যখন মানুষ কেবল নিজের জন্য ভাবে, তখন সে সংকীর্ণ হয়; কিন্তু যখন সে সবার মঙ্গলের জন্য যজ্ঞ (নিঃস্বার্থ কাজ) করে, তখন জগত তাকে সব দিয়ে পূর্ণ করে দেয়।

ধর্মীয় বিচারে, এটি হলো মহাজাগতিক ভারসাম্য। আমরা শ্বাস নিচ্ছি কারণ গাছ আমাদের অক্সিজেন দিচ্ছে, আমরা ফসল খাচ্ছি কারণ বৃষ্টি আমাদের অন্ন দিচ্ছে—এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি মহাযজ্ঞ। আমাদেরও উচিত কর্মের মাধ্যমে এই চক্রে অংশ নেওয়া। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বোঝাচ্ছেন যে যুদ্ধ করা তাঁর ক্ষত্রিয় ধর্ম, আর এই ধর্মের পালনই হলো তাঁর যজ্ঞ। এই যজ্ঞ পালন না করলে সৃষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হবে। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে আমরা সমাজের থেকে যা পাই, তা সেবার মাধ্যমে ফিরিয়ে দেওয়া আমাদের পবিত্র কর্তব্য।