॥ অধ্যায় ৩, শ্লোক ১১ ॥

দেবান ভাবয়তানেন তে দেবা ভাবয়ন্তু বঃ ।
পরস্পরং ভাবয়ন্তঃ শ্রেয়ঃ পরমবাপ্প্যথ ॥ ৩.১১ ॥

সরল ভাবার্থ

এই যজ্ঞের দ্বারা তোমরা দেবতাদের তুষ্ট করো এবং দেবতারাও তোমাদের তুষ্ট করুন। এইভাবে পরস্পরকে সাহায্য ও প্রীতি দান করে তোমরা পরম মঙ্গল লাভ করো।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এই শ্লোকটি হিন্দু দর্শনের 'পারস্পরিকতা' বা 'ইকোলজিক্যাল ব্যালেন্স'-এর মূল ভিত্তি। এখানে 'দেবতা' বলতে প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তিকে বোঝানো হয়েছে—যেমন সূর্য, বায়ু, জল এবং অগ্নি। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে মানুষের দায়িত্ব হলো যজ্ঞের (নিঃস্বার্থ কর্ম ও কৃতজ্ঞতা) মাধ্যমে এই শক্তিগুলোকে পুষ্ট করা। যখন মানুষ প্রকৃতিকে সম্মান দেয় এবং যজ্ঞের মাধ্যমে উৎসর্গ করে, তখন দেবতারা প্রসন্ন হয়ে বৃষ্টি, আলো এবং অন্ন দান করেন।

'পরস্পরং ভাবয়ন্তঃ' কথাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি চক্রাকার সম্পর্ক। আমরা যদি কেবল প্রকৃতির থেকে কেড়ে নিতে থাকি এবং বিনিময়ে কিছু না দিই, তবে ভারসাম্য নষ্ট হয়। যজ্ঞের মূল উদ্দেশ্য হলো স্বার্থপরতা ত্যাগ করে বৃহত্তর জগতের কল্যাণে কাজ করা। যখন আমরা নিঃস্বার্থভাবে কাজ করি, তখন জগত আমাদের রক্ষা করে। এই পারস্পরিক আদান-প্রদানই হলো জীবনের চাবিকাঠি।

ধর্মীয় বিচারে, এটি হলো কৃতজ্ঞতাবোধের শিক্ষা। আমরা যা কিছু ভোগ করছি—আমাদের শরীর থেকে শুরু করে বাতাস পর্যন্ত—সবই প্রকৃতির দান। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বোঝাচ্ছেন যে যুদ্ধ করা তাঁর ক্ষত্রিয় কর্তব্য, আর এই কর্তব্য পালনই হলো তাঁর যজ্ঞ। যদি তিনি এই কর্তব্য না করেন, তবে তিনি এই পারস্পরিক সম্পর্ক ভঙ্গ করবেন। পরম মঙ্গল বা 'শ্রেয়' লাভের একমাত্র উপায় হলো ব্যক্তিগত লাভের চিন্তা ছেড়ে সমষ্টির কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে আমরা বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নই; আমরা এক বিশাল মহাজাগতিক পরিবারের অংশ, যেখানে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল।