॥ অধ্যায় ৩, শ্লোক ৩৫ ॥

শ্রেয়ান্ স্বধর্মো বিগুণঃ পরধর্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ ।
স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্মো ভয়াবহঃ ॥ ৩.৩৫ ॥

সরল ভাবার্থ

উত্তমরূপে অনুষ্ঠিত অন্য ধর্মের (পরধর্ম) চেয়ে গুণহীন হলেও নিজের ধর্ম (স্বধর্ম) পালন করা শ্রেয়। নিজের ধর্মে থেকে মৃত্যুও ভালো, কিন্তু অন্য ধর্ম (অন্যের অনুকরণ) করা অত্যন্ত ভয়াবহ বা বিপদজনক।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এটি গীতার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক জীবনদর্শন। এখানে 'ধর্ম' মানে কেবল উপাসনা পদ্ধতি নয়, বরং নিজের কর্তব্য এবং স্বভাব। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, অন্যের নকল করে নিখুঁত হওয়ার চেয়ে নিজের অসম্পূর্ণ কাজ করাও ভালো। অর্জুনের ক্ষেত্রে স্বধর্ম হলো যুদ্ধ করা। অর্জুন ভাবছিলেন যে তিনি যদি সন্ন্যাসীদের মতো বনে যান এবং পূজা করেন, তবে হয়তো খুব ভালো হবে। কিন্তু কৃষ্ণ বলছেন, সেই 'পরধর্ম' অর্জুনের জন্য ভালো হবে না কারণ তাঁর স্বভাব যোদ্ধার।

আমরা যখন অন্যের জীবন দেখে ঈর্ষা করি এবং তাদের মতো হওয়ার চেষ্টা করি, তখন আমরা নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলি। স্বধর্মে থেকে নিজের দায়িত্ব পালন করলে ধীরে ধীরে মনের ময়লা পরিষ্কার হয়। কিন্তু পরের অনুকরণ করলে মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। 'স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ'—অর্থাৎ নিজের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি মৃত্যুও হয়, তবে সেই মৃত্যুও গৌরবময়।

ধর্মীয় বিচারে, এটি হলো আত্মিক সততার শিক্ষা। ঈশ্বর আমাদের প্রতিটি মানুষকে আলাদা করে তৈরি করেছেন। আমাদের প্রত্যেকের একটি আলাদা দায়িত্ব আছে। অর্জুনকে কৃষ্ণ বলছেন যে, তুমি যদি আজ সন্ন্যাসী হও, তবে তুমি নকল সন্ন্যাসী হবে এবং তাতে তোমার অমঙ্গল হবে। এর চেয়ে তুমি যোদ্ধা হিসেবে নিজের কর্তব্য পালন করো, এটিই তোমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দেবে। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে নিজেকে চেনা এবং নিজের সত্যকে আকড়ে ধরাই হলো জীবনের সার্থকতা।